স্কুল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে উর্মিমালা। উন্মুখ হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হঠাৎই চোখ পড়ল সাগরের ওপর। দূর থেকেই সাগর হাত নাড়ল উর্মিমালাকে। চারপাশে সতর্ক চোখ রেখে উর্মিমালা এগিয়ে যায় সাগরের দিকে। তারপর একটি রিকশা নিয়ে তারা উত্তরার তিন নম্বর সেক্টরের লেকসাইড রোডের মাথায় চলে যায়। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দুজন হাত ধরে হাঁটতে থাকে লেকের পাড় ধরে।
এই জায়গাটা খুবই সুন্দর আবার কিছুটা অদ্ভুতও। লেকের পাড়ে সারিবদ্ধভাবে বড়ো বড়ো গাছ এবং গাছের ছায়ায় শীতল রাস্তায় ছোটো ছোটো সিমেন্টের বেঞ্চ করা আছে। ঝিরিঝিরি বাতাসে শনশন শব্দে গাছের পাতার সাথে লেকের জলে মৃদু ঢেউয়ে টোল পড়ে। প্রতিটি গাছের শিকড়ে বসে আছে জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতী। কেউ তাদেরই মতো টিনএজার, কেউ তরুণ-তরুণী, কেউ আবার মধ্যবয়সী। কারো চোখে চোরাদৃষ্টি, কারো চোখ জোরা প্রেমের আলোতে খুব দীপ্তিময়। কেউ গল্প করছে, কেউ হাতে হাত রাখছে, কেউ বা আবার অশালীন অশ্লীলতায় মেতে আছে। কেউ প্রেমে মগ্ন তো কেউ পরকীয়ার পাপে আচ্ছন্ন। ওখানেই নিরিবিলি একটা জায়গা দেখে বড়ো একটি গাছের ছায়ার শিকড়ে দুজন বসে পড়ে। গল্প আর খুনসুটিতে মেতে তারা সময় ভুলে যায়। গল্প করতে করতে প্রায় দুই ঘণ্টা বয়ে যায়। উর্মিমালা হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে সাগরকে বলে তাকে স্কুলের গেটে পুনরায় ফিরে যাওয়ার জন্য একটি রিকশা ডেকে দিতে। সাগর বিরস মুখে বলে,
এখনই যাবে?
উর্মিমালার সোজাসাপটা উত্তরÑ
হ্যাঁ, স্কুল এক্ষুনি ছুটি হয়ে যাবে। ড্রাইভার আঙ্কেলও স্কুল গেটে পৌঁছে যাবে আমাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাই উনি আসার আগেই আমাকে ওখানে পৌঁছাতে হবে। নইলে মা টের পেয়ে যাবে আমি স্কুল ফাঁকি দিয়ে নিশ্চিত কারো সাথে সময় কাটাই। তখন পিটিয়ে আমার শরীরের চামড়া তুলে নেবে। চলো হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে যাই। এখানে রিকশা পাওয়া যায় না, জানোই তো!
টিফিন পিরিয়ডে ক্লাস টিচারের কাছে অসুস্থতার কথা বলে উর্মিমালা ছুটি নিয়ে এখানে সাগরের সাথে আজ দুই ঘণ্টা সময় কাটাল। যা সে প্রায়ই করে থাকে। সাগরের সাথে তার সম্পর্ক প্রায় দুই বছর হতে চলেছে। সাগরও উর্মিমালার স্কুল থেকেই এসএসসি পাস করে এখন বিএফ শাহীন কলেজে পড়ছে। সামনে তার এইচএসসি পরীক্ষা। কিন্তু তাদের এই অপরিপক্ব বয়সের প্রেমের কথা দুজনার বাসার কেউই জানে না।
ব্যবসায়ী হুমায়ুন চৌধুরী ও গৃহিণী নাসরিন চৌধুরীর মেয়ে উর্মিমালা। উর্মিমালা তাদের বড়ো সন্তান, সে ক্লাস টেনে পড়ে, সামনে উর্মিমালারও এসএসসি পরীক্ষা। ছেলে উদয় কিন্ডারগার্টেনে পড়ে কেজি টুতে। ছেলে উদয় ও মেয়ে উর্মিমালাকে একসাথে নিয়েই নাসরিন চৌধুরী সকালে বের হন। প্রথমে মেয়েকে স্কুলে ড্রপ করে তারপর ছেলের কিন্ডারগার্টেনে চলে যান এবং ছুটি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওখানেই বসে থেকে ছেলের ছুটির পর একেবারে তাকে নিয়ে বাসায় ফেরেন। বাসায় ফিরে এসে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর মেয়ের ছুটির সময় হলে তিনি ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দেন স্কুল থেকে মেয়েকে আনার জন্য। কারণ ওই সময়টাতে তিনি বাসার কাজকর্ম, রান্নাবান্না, ছেলের গোসল, খাওয়াদাওয়া নিয়ে খুব বিজি হয়ে পড়েন। মেয়েকে খুব বিশ্বাস করেন তারা। এভাবে নিশ্চিন্তেই কাটছে হুমায়ুন চৌধুরী ও নাসরিন চৌধুরীর জীবন। কারণ মেয়েটার রেজাল্ট বরাবরই খুব ভালো।
ড্রাইভার স্কুলে পৌঁছানোর আগেই উর্মিমালা স্কুল গেটের বাইরে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আমড়া ভর্তা খাচ্ছিল। নিজেদের গাড়ি দেখে ভর্তা হাতে দৌড়ে এসে গাড়িতে বসল। যেন সে স্কুল শেষ করে ছুটির পর ওখানে গাড়ির অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। বাসায় ফিরেও সে খুব স্বাভাবিক আচরণ করে। বয়ঃসন্ধিকালের প্রেম মারাত্মক আবেগি ও বিপজ্জনক হয়। পনেরো ষোল বছর বয়সে প্রেমের জন্য উর্মিমালার মতো কিছু মেয়েরা সবকিছুই করতে পারে। এ রকম ছোটোখাটো স্কুল ফাঁকি দেয়াটা তো তাদের কাছে কিছুই না।
এর মধ্যেই উর্মিমালা এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে। অন্যদিকে সাগর ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বেশ ব্যস্ত। তাদের দেখা সাক্ষাৎ তেমন হয় না। ফোনে কথা হয়। সময় বয়ে যায় সময়ের নিয়মে। তবে এবার উর্মিমালার রেজাল্ট আশানুরূপ হয়নি। সাগর চান্স পায় চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে। উর্মিমালা আগের বিদ্যাপীঠেই কলেজ শাখায় ভর্তি হয়। সাগর চলে যায় চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে। ওখানে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম সাগর উর্মিমালার সাথে ঘন ঘনই ফোনে কথা বলত। ধীরে ধীরে সে আর উর্মিমালাকে তেমন ফোন করে না। উর্মিমালা কল করলেও কথা বলে খুবই কম। সব সময়ই ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে কল কেটে দেয়। উর্মিমালার কেন জানি সাগরকে আজকাল খুব সন্দেহ হয়। এগুলো নিয়ে তাদের মধ্যে ঝামেলাও হয়।
এর মধ্যেই একদিন উর্মিমালা সাগরের ইনস্টাগ্রামে আবিষ্কার করে তার সাগর অন্য মেয়ের প্রেমে মজে আছে। এটা নিয়ে সাগরকে প্রশ্ন করলে তর্কবিতর্কে একসময় সে উর্মিমালাকে গালিগালাজ করে ফোন কেটে দিয়ে সাগর লম্বা এক মেসেজে ব্রেকআপের সিদ্ধান্ত জানায় এবং নিজের মোবাইল নম্বরও বদলে ফেলে। উর্মিমালার মন ভেঙেচুরে খান খান হয়ে যায়।
সাগর আর উর্মিমালাকে কল করে না। উর্মিমালার কচি মন ভীষণ রকমের বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। তার কিছু ভালো লাগে না। সে তখন মনের বিষণ্ণতা কমাতে নেশাগ্রস্ত ছেলেমেয়েদের সাথে মিশতে শুরু করে এবং নিজেও ধীরে ধীরে নেশার পথেই হাঁটতে শুরু করে। মা বাবা তার পড়ালেখা নিয়ে তাগিদ দিলে মেয়ে ভীষণ রেগে যায়। দরজা বন্ধ করে কান্নাকাটি করে। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করে না। কিন্তু মেয়ে নেশার পথে এগোচ্ছে এটা তারা কিছুতেই বুঝতে পারে না।
মেয়ে যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে নেশায় আসক্ত তখন তা বাবা-মায়ের নজরে পড়ে। তারা মেয়ের সাথে কথা বলে সবকিছুই জানতে পারেন। উর্মিমালার মা তাকে অনেক বোঝান। মেয়েকে বুঝিয়ে বলেন, তোমার বয়স কম। এমন ঘটনা নিয়ে তুমি ভেঙে পড়লে তোমার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে। মন থেকে সব দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে পরামর্শ দেন। কিন্তু এত বোঝানোর পরেও মেয়ে বিপথেই পা বাড়ায়। শেষমেশ না পেরে তাঁরা মেয়ের গায়েও হাত তোলেন। তখন হিতে বিপরীত হয়। উর্মিমালা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মা-বাবারও দিশেহারা অবস্থা। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মেয়েটির চোখের নিচে কালসিটে! বাবা-মায়ের বিশ্বাসী চোখেও অসহায়ত্বের স্পষ্ট ছায়া। তাদের সুখের সংসারে নেমে আসে ধোঁয়াশা আঁধারের ঘনঘটা।
এর মধ্যেই একদিন উর্মিমালা তার বান্ধবীর জন্মদিনে যাওয়ার অনুমতি চায় তার মা-বাবার কাছে। রাতে তারা সব বান্ধবী মিলে বাসায় পার্টি করবে। হুমায়ুন চৌধুরী ভাবেন, যাক তাহলে। একটু আনন্দ ফুর্তি করে মেয়ের মনটা হয়তো ভালো লাগবে! পেছনের তিক্ত স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। মেয়েটা সব ভুলে আবারো পড়ালেখায় মনোযোগী হোক। এসব ভেবে মা-বাবা তাকে বান্ধবীর বাড়িতে রাতে জন্মদিনের পার্টি করতে যাওয়ার অনুমতি দেন।
রাত বারোটাায় কেক কেটে পার্টি শুরু হয়। যদিও উর্মিমালার বাবা-মা জানেন পার্টিতে কেবল মেয়েরাই সারা রাত থাকবে। তবে এখানে আমন্ত্রিত অতিথি কেবল মেয়েরা নয়, দু চারজন ছেলে বন্ধুও আছে। কেক কাটার পর খাওয়াদাওয়া ও কেক খেয়ে রাত কিছুটা বাড়লে সবাই স্ন্যাকস জাতীয় খাবারের সাথে কোমল পানীয় পান করছে। উর্মিমালাও সেসবই খাচ্ছে। নাচেগানে বেশ রমরমা পার্টি চলছে। সবাই খুব এনজয়ও করছে। হঠাৎই উর্মিমালা যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। দাঁড়াতে গিয়ে সে ঢলে পড়ে যায় একটি সোফায়। চোখ দুটো বুজে যেতে যেতেই তার মুখের সামনে একটি অচেনা মানুষের অবয়ব দেখতে পায়।
উর্মিমালার ঘুম যখন ভাঙে, তখন সে নিজেকে একটি রুমে ধবধবে সাদা রঙের বিছানায় একদমই নিরাবরণ অবস্থায় আবিষ্কার করে। কে, কখন কীভাবে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে! তার সাথে কী হয়েছে! তার এই অবস্থান ও অবস্থার জন্য কে দায়ী সে কিছুই মনে করতে পারে না। বিছানার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে সে শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে একসময় আর্তচিৎকার করে। কিন্তু এখানে যেন কেউ নেই, সে একদমই একা!
না, সেদিন উর্মিমালা দমে যায়নি কিংবা ভেঙেও পড়েনি। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে সে উঠে দাঁড়ায়। বিছানার চারপাশে তার পরনের কাপড়গুলোকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখে ওগুলো তুলে নিয়ে সে পরে নেয়। দরজাটা ভেড়ানো ছিল তাই তার বাইরে বের হতে তেমন ঝামেলা হয়নি। বাইরে বের হয়ে সে খেয়াল করে নির্জন স্থানে এটা একটা রিসোর্ট। একটু সামনে এগিয়ে এসে সাইনবোর্ড দেখে সে বুঝতে পারে এটা গাজীপুর। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি অটোরিকশা থামিয়ে চালককে জিজ্ঞেস করে, এখান থেকে পুলিশ থানাটা কতদূর? বেশি একটা দূরে নয় জেনে সে অটোরিকশাটিতে উঠে বসে চালককে অনুরোধ করে বলে, আমাকে থানায় নিয়ে চলুন প্লিজ। থানায় পৌঁছে উর্মিমালা তার বাবাকে কল করে গাজীপুর সদর থানায় আসতে বলে। পুলিশ অফিসারকেও তার সাথে ঘটে যাওয়া সবকিছুর বর্ণনা দেয়। বাবা-মা এসে মেয়ের দুটি হাত দুজনে খুব শক্ত করে ধরে মেয়ের সাথেই দাঁড়ায়।
উর্মিমালা এখন মেডিকেলে পড়ে। কিছুদিন পরই সে ডাক্তার হয়ে বের হবে। সে রাতে তার সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত পৈশাচিক ঘটনার বিচার পেয়েছিল সে। তার বান্ধবীরাই সাক্ষী দিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে উর্মিমালার সাথে বসে কে এবং কারা সফট ড্রিংক পান করছিল, সেটা তার বান্ধবীরা দেখেছিল। তারপর হঠাৎই তারা আর উর্মিমালাকে দেখতে না পেয়ে ওর মোবাইলে কল করলে তা বন্ধ দেখাচ্ছিল। বান্ধবীরা ভেবেছিল উর্মিমালা হয়তো বাসায় ফিরে গেছে। তার সাথে এ রকম নির্যাতন হতে পারে তারা সেটা কল্পনাও করেনি। বান্ধবীদের সাক্ষী থেকেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অপরাধী তিন যুবক। ভয়ংকর সেই রাতের পর উর্মিমালা আর কোনোদিন মাদক ছুঁয়ে দেখেনি। বাবা-মায়ের সাপোর্ট আর উর্মিমালার সাহসিকতার কারণে আজ তার জীবন আলোর দিশায় হাঁটছে।