সনেট, মহাকাব্য, ক্রমবর্ধমান উত্তরাধুনিক ভাবধারা ও কবিতার বিচিত্রতা নির্মাণে তিনি জীবনের বহুবিধ দিক স্পর্শ করেছেন। বাংলা কবিতাকে নিয়ে গেছেন মাতৃভূমির মানচিত্রের বাইরে। অনুবাদের মাধ্যমে নানা দেশে সমাদৃত এই কবিকে ইয়োরোপ দিয়েছে হোমার পুরস্কার। পশ্চিমবঙ্গের কবি-সমালোচক জ্যোতির্ময় দত্ত তাঁকে “বাংলার ভূমিজ এক নতুন শক্তি” বলে উল্লেখ করেছেন। গ্রিক কবি মারিয়া মিস্ট্রিয়টির ভাষায় তাঁর কবিতা “দর্শনাশ্রয়ী, অসংখ্য প্রতীকে পরিপূর্ণ।”
কবিতার মতো গদ্যেও যে নতুন সৌন্দর্য নির্মাণ করা যায় এই ভাবনায় বিশ্বাসী হয়ে তিনি লিখেছেন গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ-ভ্রমণকাহিনি। ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’সহ ইতিপূর্বে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সাতটি প্রবন্ধগ্রন্থ। বাংলাদেশের কবিতা বিষয়ে বিশ্লেষণ ও সার্বিক আলোচনায় বর্তমান গ্রন্থে তিনি আমাদের কবিতার ভাব-ভাষা-ঐতিহ্য ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন, “আমি শুরু করেছি মধ্যযুগের বাংলা কবিতা বিষয়ে একটি প্রবন্ধ দিয়ে। বুঝে নিতে চেয়েছি ছন্দ, ভাষা ও কলাকৌশলের কোন পর্যায় থেকে আমরা সামনের দিকে এগিয়েছি। এই কালপর্ব পেরিয়ে এসে অবশ্যই মধুসূদন দত্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ভাব-ভাষা-ছন্দ, বুনন-বর্ণনা-বক্তব্যে নানা পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন। পরে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের দামামা বাজিয়ে একটি আলাদা সুর ও স্বর তৈরির ভেতর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন আধুনিক কবিতার ক্ষেত্র নির্মাণে। জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসুর জন্মও বাংলাদেশ নামক ভ‚খন্ডের ভেতরেই। ফলে তাঁদের কবিতার বিশাল ব্যাপ্তি বাংলাদেশের কবিতাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে; পরের প্রজন্মের কবিদের দিকনির্দেশনা দিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে।” এই বই কবি, কাব্যপিপাসু, ছাত্র-অধ্যাপক এবং নতুন দিনের সৃষ্টিশীল পাঠকের চিন্তার খোরাক জোগাবে।
হাসানআল আব্দুল্লাহ নতুন ধারার সনেটের প্রবর্তক, নাম: স্বতন্ত্র সনেট। মানুষ ও মহাবিশ্বের চলমানতা নিয়ে তিনি লিখেছেন মহাকাব্য, নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ (অনন্যা, ২০০৭)। ২০১৪-এর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নির্বাচিত কবিতার দ্বিতীয় সংস্করণ। ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়েছে কবিতার ছন্দ, ২০১১ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। তাঁর দ্বিভাষিক গ্রন্থ ব্রেথ অব বেঙ্গল, ও আন্ডার দ্যা থিন লেয়ারস অব লাইট প্রকাশ করেছে নিউইয়র্কের ক্রস-কালচারাল কমিউনিকেশন্স। মূলত কবি, কিন্তু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৩৫। হাসানআল আব্দুল্লাহ ২০১৬ সালে চীন সরকারের আমন্ত্রণে সে দেশে অনুষ্ঠিত।আন্তর্জাতিক সিল্ক কেউ কবিতা উৎসবে যোগ দেন এবং একই বছর বিশ্ব কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্যে তিনি ইয়োরোপীয় কবিতা পুরস্কার 'হোমার মেডেল'-এ ভূষিত হন। স্বতন্ত্র সনেটের জন্যে ২০১০ সালে তিনি পান লেবুভাই ফাউন্ডেশন পুরস্কার। ২০০৭ সালে তিনি নিউইয়র্কের অন্যতম প্রধান শহর কুইন্সের পোয়েট লরিয়েট ফাইনালিস্টের সম্মান পান। ইংরেজী, ফরাসী, স্প্যানিশ, কোরিয়ান, চাইনিজ, পোলিশ ও ভিয়েৎনামী ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা; স্থান পেয়েছে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অ্যান্থোলজিতে। আমন্ত্রিত কবি হিসেবে কবিতা পড়েছেন মার্কিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি আন্তর্জাতিক দ্বিভাষিক কবিতা পত্রিকা শব্দগুচ্ছ সম্পাদক এবং ১৯৯৮ সাল থেকে নিউইয়র্ক সিটির হাইস্কুলে গণিত শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।