সৈয়দ মুজতবা আলী তরুণ রবীন্দ্রোৎসাহীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: ‘রবীন্দ্রনাথের রচনাই তাঁর শ্রেষ্ঠ টীকা—ঐ কাব্য বারবার অধ্যয়ন করো, অন্য টীকার প্রয়োজন নাই।’ কিন্তু সবসময়ই খানকয়েক সেকেন্ডারি লিটারেচার পড়ে তার পর মূল রচনা ছুঁয়ে অভ্যস্ত আমার মন রবীন্দ্রনাথের বেলায়ও ব্যতিক্রম মানেনি, সৈয়দ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে অবগত থাকার পরেও। এর কারণ আত্মবিশ্বাসের অভাবের চেয়ে মেধা-প্রতিভার দীনতাই হবে বেশি। কারণ মূল রচনা থেকেই অধিকাংশটা বুঝে নিতে চেষ্টা যে করিনি তা না, করে ব্যর্থ হয়েছি। সরল স্বীকারোক্তি। আর ব্যাপারটা ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে চাইলে বলা যায়, আমার পারফেকশনিস্ট মন কোনো রচনার নানা আঙ্গিকের পাঠ না-পড়লে তৃপ্তিও পায় না। এ-ই হয়তো হবে সান্ত্বনা দিয়ে হীনম্মন্যতাবোধকে ভুলে থাকার কৌশল।
অশোককুমার মিশ্রের রবীন্দ্রকাব্য-ব্যাখ্যা সম্পর্কিত এ-বইটি নিয়ে কিছু বলার আগেই, কবিতা সম্বন্ধে দুটি ধারণা—কবিতাব্যাখ্যা আর কবিতাবোঝা—এই দুই প্রথাগত ধারণাকেই যে আমি সমর্থন করি, তা হয়তো স্পষ্ট আপনাদের কাছে। অর্থাৎ ‘শিল্পকর্ম শুধু অনুভবের বিষয়, বোঝার নয়।’ কিংবা ‘শিল্পকর্মের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, তা সম্ভব নয়।’—এসব অধুনা-চলতি কথায় আমার ঈমান নেই, তা স্পষ্ট। তাই তো চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কিংবা এ-সময়ের অশোককুমার মিশ্র—কারো করা রবীন্দ্রনাথের তফসিরই পড়া বাকি রাখিনি।
ড. মিশ্রের “দর্পণে রবীন্দ্র কবিতা” ধরনে-বিষয়ে-জাতে-বৈশিষ্ট্যে মূলত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের “রবি-রশ্মি” আর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের “রবীন্দ্র-কাব্য-পরিক্রমা” ধাঁচেরই বই। একটি নতুন সংযোজন বলা যায়, এ-ধারায়। বর্তমান লেখকের ব্যাখ্যা যে তাঁর পূর্বসূরি ব্যাখ্যাতাদ্বয়ের চেয়ে পুরোপুরি বিসদৃশ হয়েছে কোথাও, এমন হয়নি। বিশেষজ্ঞ-সমালোচকগণের ব্যাখ্যার এই যে ঐক্য-সামঞ্জস্য, এটা কিন্তু প্রমাণ করে, যে-কোনো শিল্পকর্মের একটি মান ব্যাখ্যা হয়তো করা সম্ভব।
বইটি, ড. অশোক মিশ্রের এ-বইটি, তাহলে কেন স্বতন্ত্র অপর দুই বই থেকে? স্বতন্ত্র—প্রথমতই, সহজবোধ্যতার কারণে। ড. মিশ্র এ-কালের লেখক। তাঁর ভাষাটাও এ-কালের। এবং এ-কালের পাঠকদের পাঠের আরামের জন্য, উপস্থাপনের যেসব কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো তিনি অনুসরণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, ড. মিশ্র শুধু কবিতার বিষয়ই আলোচনা করেননি, সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কবিতাগুলোর প্রকরণ সম্বন্ধেও। কবিতা-লিখিয়ে, সমালোচক, কিংবা বাংলা সাহিত্য বিভাগের ছাত্রদের জন্য বেশ উপকারী হবে এটা। প্রকরণের আলোচনা কিন্তু “রবি-রশ্মি” বা “রবীন্দ্র-কাব্য-পরিক্রমাতে” হয়নি। তৃতীয়ত, বইয়ের মাঝারি কলেবরের কারণে। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বইয়ের মতো হাজার খানেক পৃষ্ঠার বই এ নয়, তার অর্ধেক—সাড়ে চারশো পৃষ্ঠার কিছু বেশি। অর্ধেক হয়েও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কবিতার আলোচনা, বা কোনো কবিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বাদ যায়নি। হ্যাঁ, অপর দুই লেখকের বইয়ের যে-অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, খানিক পরপরই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পাশ্চাত্য কবিদের চিন্তা বা কবিতার তুলনামূলক আলোচনা, সেটা এ-বইতে অপেক্ষাকৃত কমই পাওয়া যাবে। একদিক দিয়ে এটা ভালোই। তবে, জানার সর্বগ্রাসী ক্ষুধা আছে যাঁদের, তাঁরা অন্য দুই লেখকেরও শরণাপন্ন হবেন, এ-ই কাম্য। হয়তো আমার মতো তখন শুধু রবীন্দ্রনাথই নয়, একটু ব্রাউনিং, একটু ওয়ার্ডসওয়ার্থ-শেলী পড়ার বাসনা, তাঁদের জগৎ সম্বন্ধেও জানার বাসনা তৈরি হবে।