ব্যক্তি যেমন একজন স্বতন্ত্র মানুষ, আবার সমস্টিরও প্রতিনিধি। কেননা সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন মানুষটিও তার আচরণে, প্রকাশে, জীবনযাপনে তার সময়ের সমাজ, রাজনীতি ও আর্থনীতিক প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকেন। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে, সক্রিয়-নিষ্ক্রিয়ভাবে। সবসময় প্রভাবক না হলেও তিনি প্রভাবিত হন। প্রভাবিত হতে হয়। তাকে। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। ফলে ব্যক্তি-স্মৃতিচারণমূলক লেখালেখিতে শুধু ব্যক্তি থাকেন না। থাকে ঐ-নির্দিষ্ট ব্যক্তির সময়কার সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, এবং অর্থনীতিও। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী রচিত ‘আমার আপন তিনজন’ বইটির পাঠপ্রতিক্রিয়ায় আমার এ-রকম একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছে। একশ’ পঁয়ত্রিশ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। লেখক বইটিতে তিনজনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন। তাঁর বাবা, মা এবং স্ত্রী। এ-তিনজনের মধ্যে একমাত্র লেখকের স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরী ছাড়া বাকীরা সেভাবে পরিচিত নন। তাহলে অপরিচিত মানুষজন নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা পাঠক পড়বে কেন? একজন বিখ্যাত-প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপক-লেখকের বাবা-মা বলে? সেটি হয়তো হতে পারতো। কিন্তু তার আবেদন সীমিত হয়ে পড়তো। নিশ্চিতভাবে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বইটি এখানেই আপন মহিমায় উজ্জ্বল। তিনি সেটা হতে দেননি। তিনি তাঁর বাবা-মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। আবেগাপ্লুত হয়েছেন। বাস্তবের গল্প বলেছেন। কিন্তু খুব সচেতনভাবে তুলে এনেছেন একটি সময়ের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি, সংস্কৃতিকে। এর ভেতরে ক্রমাগত বদলে যাওয়ার উপাদানগুলোকে। ফলে তিনটি চরিত্রের মধ্যে অবশ্যম্ভাবীভাবে উঠে এসেছে আরও অসংখ্য বাস্তব চরিত্র। যাদের কাউকে কাউকে আমরা চিনি। আবার কাউকে কাউকে চিনি না। ফলে লেখকের বাবা-মা-স্ত্রী সম্পর্কে পড়তে গিয়ে পাঠক দেখা পাবেন ইতিহাসের, সমাজবিজ্ঞানের এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির। পাঠক খুঁজে পাবেন, পাকিস্তান সৃষ্টির রাজনৈতিক অর্থনীতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল সমাজ, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে লিঙ্গীয় রাজনীতির রকমফের, আমাদের শিল্প-সাহিত্য, তার বিকাশের ইতিহাস, এমন আরও অনেক কিছু। না, লেখক কোথাও তত্ত্ব হাজির করেন নি, করার চেষ্টাও করেন নি। তিনি গল্পই বলেছেন। স্মৃতিচারণ করেছেন। সেইসব গল্প-স্মৃতিচারণ পড়তেই পড়তেই পাঠক এ-সবের দেখা পাবেন। আমার কাছে মনে হয়েছে বইটির সৌন্দর্য এখানেই।