“অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি
জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।
অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন।
অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন;
অবাক পৃথিবী! অবাক করলে আরও—
দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারও।
অবাক পৃথিবী! অবাক যে বারবার
দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার।
হিসেবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে
দেখেছি লিখিত—‘রক্ত খরচ’ তাতে।
এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম,
অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম!”
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। বাংলা সাহিত্যের এক প্রিয় নাম। মাত্র একুশ বছর তিনি এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছিলেন। তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য তাঁকে আশ্চর্য প্রতিভা বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু পরিপূর্ণ বিকশিত হওয়ার আগেই ঝরে গেলেন এই উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি কবিতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর সংগ্রামী জীবন, মানবতার চেতনায়, দীপ্ত সাহসের কথা। কিশোর কবি সুকান্ত লিখেছেন—
“বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে…”
এমন শক্তিশালী উচ্চারণ করা সম্ভব হয়েছিল কবি সুকান্তের ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর লিখনীতে প্রতিফলিত করেছেন ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, শোষিতের বেদনা, শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন, সাম্যের আকাঙ্ক্ষা এবং একটি মানবিক পৃথিবী নির্মাণের প্রত্যয়। দিনরাত স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। ছুটেছেন পরাধীন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গড়ে তুলেছেন লাইব্রেরি, কিশোরদের জন্য কিশোর বাহিনী। আজ এই সময়ে এসে ভাবতে অবাক লাগে এত অল্পবয়সে একজন মানুষ কীভাবে এত কাজ করেছিল। এ চিরতরুণ কবির জন্মশতবর্ষে নতুন করে আমাদের স্মরণ করে দেয়, আগামী পৃথিবী বিনির্মাণের। তাঁর দু’চোখ ভরা স্বপ্নকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্বকে।
প্রিয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার কালীঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটে নানার বাড়িতে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নিবারণ ভট্টাচার্য ছিলেন ‘সারস্বত লাইব্রেরি’র স্বত্বাধিকারী। যা একাধারে ছিল বইয়ের প্রকাশনা ও বিক্রয়কেন্দ্র। আর মা সুনীতি দেবী। তঁাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার কোটালীপাড়ার ঊনশিয়া গ্রামে।
কবি সুকান্তের নাম রেখেছিলেন তঁার জ্যাঠাতো বোন রানী ভট্টাচার্য। মনোজ ভট্টাচার্য তাঁর স্মৃতিকথায় বলেন, ‘বাংলা দেশের অত্যন্ত খ্যাতিমান সাহিত্যিক ‘রমলা’—রচনাকার মণীন্দ্রলাল বসু ছিলেন আমাদের তখনকার যৌথ পরিবারের তরুণদের সবচেয়ে প্রিয় লেখক। তাঁর একটি গল্প—‘সুকান্ত’ আমাদের সবার সবচেয়ে প্রিয় গল্প। সেই সময় আমাদের কাকীমার একটি পুত্রের জন্ম হলো। আমার দিদি প্রিয় গল্পের নায়কের নাম অনুসরণ করে তাঁর সদ্যোজাত ভাইয়ের নাম রাখলেন ‘সুকান্ত’। গল্পের সুকান্তর মৃত্যু হয়েছিল যক্ষ্মা রোগে। কী আশ্চর্য! আমার দিদির মৃত্যুর ষোলো বছর পরে আমাদের সুকান্তর মৃত্যুও যক্ষ্মা রোগেই হলো। কাব্য জগতে সুকান্তর নাম আজ এক স্বীকৃত সত্য।’
সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন রানী ভট্টাচার্য। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। কবির শৈশবের খুব কাছেরজন বলতেই রানীদি ছিলেন। রাতে ঘুমাতে গিয়ে শোনাতেন নানা গল্প, কবিতা, ছড়া। একদিন আচমকা রানী ভট্টাচার্যের মৃত্যু হলো, ভীষণ ভেঙে পড়লেন সুকান্ত। রানীদির মৃত্যু আর মাকে হারানোই দুরন্ত সুকান্তের জীবনে নেমে আসে এক নিঃসঙ্গতা।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নেই বলেই চলে। ভর্তি হয়েছিল কমলা বিদ্যামন্দিরে। সেখানে পরিচয় হয় বন্ধু শৈলেন সরকারের সঙ্গে। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণায় বলতেছিলেন, ‘কমলা বিদ্যামন্দিরের একেবারে নিচের শ্রেণি থেকে সুকান্তর সাহচর্য লাভের সুযোগ আমার হয়েছিল। তখনকার দিনে স্কুলের ছাত্র সংখ্যা ছিল অল্প। বোধহয় কুড়িজনের বেশি ছাত্র আমরা এক ক্লাসে ছিলাম না। তারই মধ্যে ঐ লাজুক, আপাত-স্বল্পবাক ছেলেটিকে সহজেই নজরে পড়তো তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার জন্য। ধীরতা, নম্রতা ও বন্ধুপ্রীতি ছিল সুকান্তর সহজাত গুণ। বাইরে থেকে দেখে মনে হতো সুকান্ত কথা বলে কম। কিন্তু মেলামেশা করলে বোঝা যেতো ও সে ধাতের ছেলেই নয়; কল্পনার নবীনতায়, বুদ্ধির ঔজ্জ্বল্যে ও লঘু পরিহাস-প্রিয়তায় ওর সঙ্গ সর্বদাই আনন্দময় করে তুলতো।’
স্কুল থেকে বের হতো সঞ্চয় নামে একটি স্কুল সাময়িকী। সেখানে তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। তখন বয়স ৮ কিংবা ৯ বছর। লিখেছিলেন ছোটগল্প। এই গল্পটি ছিল হাস্যরসাত্মক। এরপর ‘বিবেকানন্দ জীবনী’ নামের একটি গদ্য ছাপা হয়েছিল শিখা পত্রিকায়। পরবর্তীতে সেখানে কবির অনেক লেখা প্রকাশিত হয়। স্কুল পড়াকালীন ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন। আর একটু বড় হলে, ১১-১২ বছরে লিখে ফেলেন গীতিনাট্য ‘রাখাল ছেলে’। যেটি পরে তঁার ‘হরতাল’ গ্রন্থে সংকলিত হয়।
কমলা বিদ্যামন্দিরে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ভর্তি করানো হলো বেলেঘাটা উচ্চবিদ্যালয়ে। বেলেঘাটা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই কবির কবিতা প্রকাশিত হতো বিভিন্ন পত্রিকা, সাহিত্য সাময়িকীতে। সেখানে পরিচয় ঘটে তঁার প্রিয় বন্ধু অরুণাচল বসুর সঙ্গে। অরুণাচল বসু নিজে ছিলেন একজন কবি। তাঁর মা সরলা বসুও সাহিত্যিক ছিলেন। দুই বন্ধুর মধ্যে নানা বিষয় আলাপচারিতা হতো। তঁার মা সুকান্তে অনেক স্নেহ করতেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তারা দুজনে মিলে সম্পাদনা করেছিলেন হাতে লেখা পত্রিকা সপ্তমিকা। এর পরে শতাব্দী নামে আরও একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন।
তাঁর বৌদি সরযূ দেবীর কাছে যোগীনাথ সরকারের খুকুমণির ছড়া, মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদ বধ কাব্য, টেকচাঁদ ঠাকুরের আলালের ঘরের দুলাল আর সোমদেবের কথা-সরিৎ-সাগরের পড়তো। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে পড়েছিলেন বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী। বাবার বইয়ের দোকান থাকার কারণে সুকান্ত অনেক বই পড়তে পারতেন।
দাদা মনোমোহন ভট্টাচার্যের অনুরোধে ১৯৪১ সালে কলকাতা রেডিওতে ‘গল্পদাদুর আসরে’ যোগ দেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘শীতের আহ্বান’ আবৃত্তি করেন। এই আসরের কবির লেখা গান নির্বাচিত হয়েছিল এবং সেই গানে সুর দিয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক। আনন্দবাজার পত্রিকার সভ্য ছিলেনও তিনি।
“১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ শিশুমনে যে দূষিত প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা থেকে শিশুদের কোমল সত্তাকে বাঁচানোর জন্য এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার উপযোগী প্রজন্ম তৈরি করার জন্য তিনি নিজেকে কিশোর বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর অসাধারণ নিষ্ঠায় অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটির সদস্যসংখ্যা ৩০০ থেকে ৩০ হাজারে উন্নীত হয়।”
১৯৪৪ সালে পুরোপুরি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাকে কবি এক প্রকার ছুটি-ই দিলেন। ১৯৪৫ সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন না। কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। মিটিং মিছিল, সভা সমাবেশ থেকে সর্বত্রই সুকান্ত হয়ে উঠেন সর্বত্র কর্মী ও সংগঠক। তবে সুকান্তের স্বপ্ন ছিল বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হওয়ার। কে জি বসুকে কবি বলেছিলেন, ‘যা হতে ইচ্ছে করে তা কোনোদিনেই হতে পারব না কেষ্টদা।’ তবে ম্লান হেসে বলেছিলেন, বাংলার অধ্যাপক।’
চট্টগ্রাম সম্মেলন থেকে ফিরে প্রথমে ম্যালেরিয়া, পরে কালাজ্বর এবং যক্ষা রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ৪২ দিন চিকিৎসার পরও সুস্থ করা গেল না। সবাইকে কাঁদিয়ে ১৩ মে সুকান্ত পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। রেখে যান প্রায় দেড়শত কবিতা,গান, প্রবন্ধ, চিঠিপত্রসহ নানা স্মৃতিরভাণ্ডার।
শতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্যকে স্মরণ করার উদ্দেশ্য শুধু তাঁর জন্মদিন উদযাপন নয়; বরং তাঁর সাহিত্য, দর্শন ও মানবিক চেতনাকে নতুনভাবে অনুধাবন করা এবং বর্তমান প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা জরুরি। কবি বলেছিলেন “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”—তিনি মূলত একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক পৃথিবীর গড়ে তোমার অঙ্গীকার করেছিলেন। এই অঙ্গীকার রক্ষা করার জন্য বলেছিলেন—“চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল”। কবি চলে গেছেন, রয়েছে তঁার আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষার পথ ধরে আমরা হাঁটে যাব।
‘শতবর্ষে সুকান্ত’ সংকলনটিতে গবেষক ও সম্পাদক বিশ্বনাথ দে-এর সম্পাদিত সুকান্ত বিচিত্রা ও সুজিতকুমার নাগের সুকান্ত স্মৃতি থেকে ‘স্মৃতিকথা’ লেখাগুলো সংশোধিত ও পরিমার্জিত করে পুনঃপ্রকাশ করা হলো। দুইজনের প্রতি চির কৃতজ্ঞতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই সংকলন প্রকাশের ক্ষেত্রে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ আবদুল হাই, প্রাবন্ধিক মাসুদুল হক ও শফিক উদ্দিন শুভ এবং দ্রুত সময়ে যঁারা লেখা দিয়েছেন তাঁদের প্রতি চিরঋণী।
জন্মশতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আবারও সুকান্তের অনুপ্রেরণা জেগে ওঠুক আমাদের সবার প্রাণ। জয়তু সুকান্ত...
আবু সাঈদ
ঢাকা
১৫ আগস্ট ২০২৬