বেঙ্গল মুসলিম রেনেসাঁ সিরিজ-এর চতুর্থ বইনূর নবী। ঊনবিংশ শতাব্দীতে [১৮০০-১৯০০] ইউরোপীয়বিদ্যা ওপ্রযুক্তির অভিঘাতে বাংলায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও কর্মকোলাহল সূচিত হইয়াছিল, আর উহাতে বঙ্গীয় মুসলমান কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-চিন্তাবিদেরযে অংশগ্রহণ ঘটিয়াছিল, তাহার নির্বাচিতকিছু টেক্সট একবিংশ শতকের পাঠকের কাছে নতুনভাবে, নতুন অবয়বে হাজির করাই বেঙ্গল মুসলিম রেনেসাঁ সিরিজ-এর উদ্দেশ্য।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিক্ষানুরাগী মোহাম্মদএয়াকুব আলীচৌধুরী প্রণীত নূর নবী বিশ্বমানবতার মুক্তির দূতহজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর জীবনকাহিনী, যাহা অত্যন্তসরল, মধুর ও কাব্যিক ভাষায় বিবৃত হইয়াছে।আরবের অন্ধকার যুগে জন্মগ্রহণ করিয়া হজরত অতি শৈশবেই মাতা-পিতা ও দাদাকে হারাইয়া চাচা আবু তালেবের স্নেহছায়ায় প্রতিপালিত হইয়া কিভাবে সাধনার চরম স্তরে উপনীত হন এবং নবুয়ত-প্রাপ্তিরপর মানবজাতিকে ইসলামের মহাসত্য শুনাইতে জীবনপাত করেন, সেই কথাই এয়াকুব আলীচৌধুরী কাহিনী আকারে কিশোর-কিশোরীসহ সকল বয়সের পাঠকের উপযোগী করিয়া তিনি তুলিয়া ধরিয়াছেন।
ইসলামের একেশ্বরবাদের বাণীকে তৎকালীন পৌত্তলিক আরববাসী ওকোরেশ সমাজ ঘোরতর ধর্মদ্রোহিতা বলিয়া বিবেচনা করেন। ফলেতাঁহাকে সীমাহীন নির্যাতন, বয়কট, পাথর-বৃষ্টি ওপ্রাণনাশের ষড়যন্ত্রের সম্মুখীনহইতে হয়। অবশেষে ধৈর্য, প্রেম ওসত্যনিষ্ঠার বলেতিনি অত্যাচারের ভয়াবহ বিভীষিকাদূর করিয়া মানবতার বিজয় প্রতিষ্ঠা করেন।
হজরতের অপরিসীম কষ্ট-সহিষ্ণুতা, মরুভূমির আগুন-হাওয়া ওপাহাড়ের গুহায় কাটানো দুঃখময় দিনরাত্রি এবং অনাহার-অনিদ্রার মর্মভেদী বয়ানের মাধ্যমে এইগ্রন্থ পরিণতি লাভ করিয়াছে। রূপকথার আবহ আর প্রাঞ্জল ছন্দময় সাধু গদ্যরীতিতে নির্মিত এই গ্রন্থের আকর্ষণ তাই রূপকথার অধিক।নবীজীবনের মর্মকথা কোমল ভাষায় হৃদয়ঙ্গম করাইবার জন্য গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে চিরকাল স্মরণীয় ও পঠিত হইবার যোগ্য। গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশকাল ১৩২৪ বঙ্গাব্দ (১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দ)।
মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী যিনি সচরাচর সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী নামে অভিহিত বাংলাভাষার একজন লেখক এবং সাংবাদিক। তিনি শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে পশ্চাৎপদ মুসলমানদের অগ্রগামী করেন। জন্ম রাজবাড়ী জেলার পাংশার মাগুরাডাঙ্গা গ্রামে ১৮ কার্তিক ১২৯৫-এ (১৮৮৮)। পিতা পুলিশ অফিসার এনায়েতুল্লাহ চৌধুরী। পাংশা হাইস্কুল থেকে এমই এবং রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেও বিএ ক্লাসে পড়ার সময় দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়ায় পড়ালেখা ছাড়তে বাধ্য হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকতে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘কোহিনূর’ সম্পাদক রওশন আলী চৌধুরী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে তিনি সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ।১৯১৪-১৫ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই থানার জোরওয়ারগঞ্জ হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২০-২১ খ্রিষ্টাব্দে পাংশা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার সময় অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের হাতে কারাদণ্ড ভোগ করেন। কারামুক্তির পর কলকাতায় যান এবং সাংবাদিকতায় যোগ দেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির (৪ সেপ্টেম্বর, ১৯১১) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪টি। নূরনবী গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের প্রশংসাবাণী সংযোজিত হয়েছে। ধর্মের কাহিনী (১৯১৪), নূরনবী (১৯১৮), শান্তিধারা (১৯১৯), মানব মুকুট (১৯২২)। এছাড়া বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে এয়াকুব আলী চৌধুরী অপ্রকাশিত রচনা নামীয় একটি গ্রন্থ। এর সম্পাদক আমীনুর রহমান। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৪০ সালে ফরিদপুর অবস্থানকালে তার মৃত্যু হয়।