মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন, যাঁদের জীবন কোনো নির্দিষ্ট সময়, ভূখণ্ড বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা তাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা, ত্যাগ এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মের মধ্য দিয়ে যুগের সীমানা অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হন। তাঁদের পরিচয় পদ-পদবি বা পার্থিব প্রাচুর্যে নয়; বরং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত জীবন, সততার দীপ্তি এবং কর্মের উত্তরাধিকারে। এমন মানুষদের জীবন শুধু ইতিহাসের উপকরণ নয়, বরং সমাজ নির্মাণের পাঠ্যপুস্তক। আলহাজ্ব মোঃ সেকান্দর আলী তালুকদারÑযিনি সবার কাছে স্নেহভরে ‘সেকান্দর মাস্টার’ নামে পরিচিতÑছিলেন তেমনই এক বিরল আলোকমানব।
বাংলার গ্রামীণ সমাজে শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশ এবং সামাজিক নেতৃত্বের ইতিহাস লিখতে গেলে অসংখ্য নীরব কর্মযোগীর নাম উচ্চারিত হওয়ার কথা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তাঁদের অধিকাংশের অবদান সময়ের প্রবাহে বিস্মৃত হয়ে যায়। কারণ তাঁরা প্রচারের মানুষ ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন কর্মের মানুষ। তাঁরা বক্তৃতার চেয়ে কাজকে বড় মনে করতেন, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে সমাজের উন্নয়নকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। সেকান্দর মাস্টার সেইসব নীরব আলোকবর্তিকার অন্যতম, যাঁদের কর্ম একটি জনপদের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
১৯১৯ সালে ব্রিটিশ শাসিত বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর জন্ম। সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতা ছিল শিক্ষাবঞ্চনা, দারিদ্র্য, কুসংস্কার এবং সুযোগের সীমাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ মুসলিম সমাজ তখনও আধুনিক শিক্ষার আলো থেকে অনেকটাই দূরে। কিন্তু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই মানুষটি খুব অল্প বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেনÑশিক্ষাই একটি জাতির মুক্তির প্রধান শক্তি। তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষা শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়; শিক্ষা মানুষকে চিনতে শেখায়, সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায় এবং সমাজকে পরিবর্তনের শক্তি জোগায়।
এই উপলব্ধিই তাঁর জীবনকে একটি মহান লক্ষ্য দিয়েছে। তিনি নিজে ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ করেন। উজানী মাদরাসায় সহীহ কোরআন শিক্ষা, ধামতী আলিয়া মাদরাসায় উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা, হযরত আজিমউদ্দীন (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক সাধনা এবং পরবর্তীকালে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, যেখানে আধুনিক শিক্ষাবোধ, ইসলামী মূল্যবোধ এবং মানবিক দায়িত্ববোধ এক সুতোয় গাঁথা ছিল।
সেকান্দর মাস্টারের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলোÑতিনি যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন, তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতেন। তিনি শিক্ষা নিয়ে কথা বলেছেন, কারণ তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি মানবসেবার কথা বলেছেন, কারণ তিনি নিজের জমি মানুষের কল্যাণে দান করেছিলেন। তিনি ধর্মীয় আদর্শের কথা বলেছেন, কারণ তিনি আজীবন ইমাম হিসেবে মানুষের নৈতিক উন্নয়নে কাজ করেছেন। তিনি দানশীলতার শিক্ষা দিয়েছেন, কারণ নিজের ঘরের খাদ্য পর্যন্ত অভাবগ্রস্ত মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। এই কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্যই তাঁকে একজন প্রকৃত আদর্শ মানুষে পরিণত করেছে।
১৯৩৯ সালে নিজের ৪৫ শতক জমির ওপর বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্তগুলোর একটি। আজকের দিনে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যতটা সহজ মনে হতে পারে, সেই সময় তা ছিল অকল্পনীয় সাহসের কাজ। তখন সরকারি সহায়তা ছিল সীমিত, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্বল এবং শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহও তেমন গড়ে ওঠেনি। কিন্তু তিনি জানতেন, একটি বিদ্যালয় মানেই একটি নতুন সমাজের জন্ম। তাই তিনি শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই করেননি, টানা সাত বছর বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে প্রমাণ করেছিলেনÑপ্রকৃত শিক্ষক বেতনের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য কাজ করেন।
একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ইমাম। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় নিজ গ্রামে বিনা বেতনে ইমামতি করেছেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পর ঢাকার শান্তিনগর জামে মসজিদে আরও দীর্ঘ তেইশ বছর ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ইমামতি ছিল কেবল নামাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের চরিত্র গঠন, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং ইসলামের সৌন্দর্যকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার এক অব্যাহত প্রয়াস।