‘ইডিয়ট’: এক অসুস্থ সৌন্দর্যের সন্ধানে বাংলা সাহিত্যের দরবারে দস্তয়েভস্কি নতুন নন। ‘অপরাধও শাস্তি’, ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ’, ‘নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড’—এসব নাম বাংলার সাহিত্য-পিপাসু পাঠকের কাছে পরিচিত। অথচ ‘ইডিয়ট’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রাঞ্জল ও নান্দনিক বাংলা অনুবাদ এতদিন ছিল এক অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা। এই অনুবাদ সেই শূন্যস্থান পূরণের এক নম্র প্রচেষ্টামাত্র; কিন্তু এই ‘মাত্র’ শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রয়োজনীয়তা, যা হয়তো পাঠক প্রথম দর্শনে বুঝতে পারবেন না, কিন্তু উপন্যাসটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভাসিত হবে।
‘ইডিয়ট’—শিরোনামের বিপরীতে যে মহাকাব্য
‘ইডিয়ট’ শব্দটি বাংলায় যেন একধরণের গালি। আমরা যাকে ‘বোকা’ বা ‘নির্বোধ’ বলি, তাকেই ইংরেজিতে ‘ইডিয়ট’ বলা হয়। কিন্তু দস্তয়েভস্কি এই শব্দটিকে কী অসাধারণ দক্ষতায় উল্টে দিয়েছেন! উপন্যাসের নায়ক প্রিন্স লেভনিকোলায়ে ভিচমিশকিন—যাকে সমাজ ‘ইডিয়ট’ আখ্যা দেয়—আসলে সেই একমাত্র চরিত্র, যিনি সত্য, ভালোবাসাও সহমর্মিতাকে অকৃত্রিম ভাবে ধারণ করেন। তাঁর সরলতা, তাঁরবিশ্বাস, তাঁরকোনোহিসাব-নিকাশহীনআবেগ—এগুলোসমাজেরচোখে ‘বোকামি’। কিন্তু দস্তয়েভস্কি আমাদের দেখান, এই ‘বোকামি’ই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে, যদি আমরা তা চিনতে শিখি।
এই উপন্যাসটি তাই ‘ইডিয়ট’-এর কাহিনি নয়; এটি ‘ইডিয়ট’-এর সংজ্ঞাকে ভেঙে ফেলার একসাহসী প্রচেষ্টা। এটি আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: সমাজ যাকে বোকা বলে, সেকি আসলে বোকা, নাকি সমাজের ‘বুদ্ধিমত্তা’ই একরকম পাগলামি?
আমাদের সময়ের জন্য এই উপন্যাস কেন জরুরি! আমরা যে সময়ে বাস করি, সেই সময়ের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—আমরা সবকিছুকে ‘হিসাব’ করে দেখি। ভালোবাসা, সম্পর্ক, নৈতিকতা, এমনকি সত্যকেও আমরা যাচাই করি লাভ-লোকসানের মানদণ্ডে। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর একটি হলো:
“যদি খ্রিস্ট শুধুমাত্র একজন মানুষ হন? যদি তিনি কষ্ট পান, মারা যান, এবং হোলবাইন যেমন দেখিয়েছেন তেমনি একটি আঘাতপ্রাপ্ত, প্রাণহীন মৃত দেহ রেখে যান? অর্থাৎ, এটি পুনরুত্থানের প্রশ্ন।”
এই প্রশ্নটি শুধু ধর্মীয় নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমরা কি পুনরায় শুরু করতে পারি? কোনো ভুল, কোনো পতন, কোনো বিপর্যয়ের পরেও কি আমাদের মধ্যে নতুন করে শুরু করার শক্তি থাকে? ‘ইডিয়ট’ এই প্রশ্নটিকে কেবল উত্থাপন করে না, বরং তার প্রতিটি চরিত্রের মাধ্যমে এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরগুলো খোঁজে।