মোজাম্মেল হক্ (১৮৬০) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলার শান্তিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে যাঁরা সর্বপ্রথম আধুনিক পাঠ্যপুস্তক রচনায় এগিয়ে আসেন, মোজাম্মেল হক্ তাঁদের অন্যতম। তৎকালীন প্রেসিডেন্সী বিভাগের স্কুল ইন্সপেক্টর ডব্লিউ বি এল মার্টিনের সুপারিশে তাঁর একটি পদ্যের বই স্কুল বুক কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে ৪র্থ শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকরূপে গৃহীত হয়।
কলকাতার সাপ্তাহিক সময় পত্রিকায় কিছুদিন সাংবাদিকতা করার পর তিনি তামাচিকা বঙ্গ বিদ্যালয় ও শান্তিপুর জুনিয়র জুবিলি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন।
১৯২০ সালে তিনি মোস্লেম ভারত পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাতে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঁধনহারা’ উপন্যাস এবং ‘খেয়াপারের তরণী’র মতো বিখ্যাত কবিতাসহ বহু লেখা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার সম্পাদকীয়তে তিনি লেখেন: “...আমাদের এই উত্থানপ্রয়াসী পতিত সমাজের কর্ণে এই সময়ে মোস্লেমের গৌরব-কাহিনী, মোস্লেমের প্রজ্ঞা, প্রভাব, পুণ্যকথা প্রভৃতির সুর-লহরী ঢালিয়া দিতে পারিলে, এক কথায় মুসলমানের অতীতের সম্বল, বর্ত্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষার সমুজ্জ্বল ছবি তাহাদের নয়ন-সমক্ষে ধরিতে পারিলে,...প্রভূত কল্যাণ সাধিত হইতে পারিবে।...”
পত্রিকার প্রতি সংখ্যার প্রথম পাতার উপরে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত বাণী হুবহু ছাপতেন। বাণীটি ছিল: “মানব-সংসারে জ্ঞানালোকের দিয়ালি-উৎসব চলিতেছে। প্রত্যেক জাতি আপনার আলোটীকে বড় করিয়া জ্বালাইলে তবে সকলে মিলিয়া এই উৎসব সমাধা হইবে।”
মোজাম্মেল হকের অমর কীর্তি শাহনামার পদ্যানুবাদ। তাঁর ফেরদৌসী-চরিতও অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কুসুমাঞ্জলি, প্রেমাহার, জাতীয় ফোয়ারা; উপন্যাস জোহরা, দরাফ খান গাজী এবং গদ্যগ্রন্থের মধ্যে মহর্ষি মনসুর, হজরত মুহাম্মদ, খাজা মইনউদ্দিন চিশতি, হাতেমতাই, টিপু সুলতান উল্লেখযোগ্য।
সংস্কৃত-বাহুল্য তাঁর রচনার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর পাণ্ডিত্য বিবেচনা করে তাঁকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার বাংলা বিষয়ের পরীক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেন। জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্বরত ছিলেন। সমাজসেবা ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালে তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করেন।
১৯৩৩ সালের ৩০শে নভেম্বর শান্তিপুরে নিজ বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।