ছোটবেলায় আমরা যখন চট্টগ্রামের জামালখানের বাসায় ছিলাম, তখন সেই পাড়ায় এক বাকহীন কিশোর ছেলে ছিল। জানি না এখন সে কোথায়। এই লেখা কি তার কাছে পৌঁছুবে? কিংবা বেঁচে আছে কী নেই তাও তো জানি না। ওকে ‘বোবাইয়া’ বলে ছোটরা খ্যাপাতো। তখন আমরা অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে পড়ছি। পাড়ার অন্য বাচ্চাদের আমরা বারণ করতাম এই বলে যে, এই ছেলেটাকে এভাবে এমন বিকৃত নামে ডেকে খ্যাপানো উচিত নয়। এটা অন্যায়। আমরা তখন সদ্য কিশোরী এবং শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ আর আমেনার’ গল্প পড়ছি, রবিঠাকুরের ‘হৈমন্তী’ পড়ছি, জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ পড়ে কান্নায় ভাসিয়ে দিচ্ছি। অবলা প্রাণির প্রতি মায়া কিংবা মানুষের প্রতি মানুষের মমতার সূক্ষ্ম বন্ধন গল্পের চরিত্রগুলোর মাধ্যমে আমাদের ভাবনায় তখন মিশেল হচ্ছে।
স্কুল ছুটির শেষে একদিন বিকেলে সেই ছেলেটার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম তার নাম নারায়ণ। এই নারায়ণের মায়ের কষ্ট হলো যে ছেলের অন্তরে আছে ভাষা কিন্তু মুখে নেই তার প্রকাশ। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রকাশে কিন্তু ভাষা হয়ে যায় দুর্বোধ্য কান্না কিংবা বিরক্তিকর ধ্বনি। কেউ অনুমান করে না বা বোঝার চেষ্টা করে না তাকে। যদিও নারায়ণের কোনো বাকশক্তি ছিল না, কিন্তু সে লক্ষ্য করতো সব কিছু। নারায়ণের বয়স তখন দশ কিংবা বারো এবং সে খুব সৎ ছিল। পাড়ার ক্লাবে ক্যারাম বা লুডু খেলার সময় কখনো চালাকি করতো না, উপরন্তু সে অনেকটা রেফারির মতোই কাজ করতো। কোনো পক্ষ সে অবলম্বন করতো না। সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য আকারে-ইঙ্গিতে, করুণ আকুতি দিয়ে, হাত-পা-মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতো। মাঝে মাঝে মনে হতো সে বলতে চায় তীব্রভাবে, স্পষ্টভাবে তার ভাষায় যে ‘এটা ঠিক নয়, তোমরা আমাকে বুঝতে চেষ্টা করো, ওরা ভুল’।
ফিরে যাই এবার আমার স্বাধীনতায়, আমার বাক-স্বাধীনতায়। সংবিধানে বাক-স্বাধীনতা সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হলেও আমার মনে হয় দেশের অধিকাংশ নাগরিক আজ বাকহীন। প্রসঙ্গত, সেই সময় কোনো এক কুমিল্লা বোর্ডের প্রবেশিকা পরীক্ষার সময় এক অদ্ভুত অনুবাদ এসেছিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে, বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য এবং সেটি হলো—