"পেটের ক্ষুধা মিটে না যার
এই ধরাতে ঠাঁই কোথা তার।"
কবির এই অমোঘ বাণী লিপিবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক দৈন্য-দশা দেখে। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে কথাটি উচ্চারণ করেছেন। বাংলাদেশ চিরকালীন কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের উর্বর মাটিতে যে শস্যবীজ রোপন করা হয় তার ফলন পেতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না। কৃষকরা যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির উপর ভরসা করে চাষাবাদ করতো। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। প্রয়োজনের সময় সেচ, সার, কীটনাশক ব্যবহার করে ফসল ফলাবার সব চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে। চাষিরা মাথায় ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদন বাড়াচ্ছেন যদিও তাদের ফসলের ন্যায্য দাম প্রাপ্তি নিয়ে হতাশা আছে।
ধানের উৎপাদন বাড়ছে। ডিম, দুধ, মৎস্য উৎপাদনে দেশের চাহিদা মিটছে। ডাল, তেলবীজ জাতীয় রবি শস্য উৎপাদনে দেশ এগিয়ে আছে। বিভিন্ন জাতের মৌসুমি ফল উৎপাদনও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশ নির্ভরতা অনেকটা কমেছে। দেহের পুষ্টি চাহিদা বলতে ভাতের পাশাপাশি মাছ, মাংস, ডিম, ফল জায়গা করে নিয়েছে। মানুষের ভেতর সচেতনতা বেড়েছে। সবাই সুষম খাদ্য গ্রহণে সচেষ্ট।
প্রখ্যাত কৃষি অর্থনীতিবীদ ড. জাহাঙ্গীর আলম দেশে খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন। কৃষি উৎপাদনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের কথা বলছেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করার বিভিন্ন পথ বাতলে দিচ্ছেন।
ড. জাহাঙ্গীর আলম দেশে 'কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা' বইটিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি জমি চাষ, সার, সেচ, কীটনাশক ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষকদের নগদ সহায়তার কথাও বলেছেন। দেশে কৃষক-বান্ধব সরকারকে জনকল্যাণের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
ড. জাহাঙ্গীর আলম একজন বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবীদ। তিনি একজন প্রখ্যাত গবেষক। কৃষি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করছেন। ফল স্বরূপ সরকার তাকে কৃষি উন্নয়নে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার এবং একুশে পদকেও ভূষিত করেছে। কর্মজীবনে তিনি গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ এর উপাচার্য, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সদস্য-পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিক্স এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আমরা মনে করি, দেশের মানুষের মঙ্গলের কথা যারা ভাবেন, কৃষকদের কথা যারা ভাবেন, কৃষি উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করেন, দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতার জন্য পরিশ্রম করছেন সেই সব নীতি নির্ধারক, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের জন্য বইটি অত্যন্ত উপযোগী। দেশের প্রতিটি গ্রন্থগারে সংরক্ষণ করার মত একটি উপযুক্ত বই। এ বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।
লেখক তার পরিপক্ক গবেষণার ফসল লেখনির মাধ্যমে উপস্থাপনে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। আমরা আশা করি, তার গবেষণামূলক লেখনি দেশের উন্নয়নে নতুন নতুন তথ্য ও তত্ত্বে ঋদ্ধ হবে। লেখকের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।