সঞ্জয় কুমার পাল-এর ‘দৌড়’ কাব্যগ্রন্থটি সমকালীন জীবনের এক নির্মোহ আলেখ্য, যা পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় এক কঠিন আত্মদর্শনের সামনে। কবিতাগুলোতে ফুটে উঠেছে উত্তর-আধুনিক নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা, ক্ষমতার দম্ভ, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং মানুষের ভেতরের বিচিত্র মনস্তাত্তি¡ক জটিলতা। কবির পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তীক্ষè; তিনি ধানমন্ডির ট্রাফিক জ্যাম, রবীন্দ্র সরোবরের কোলাহল কিংবা ধূলিমলিন বৃক্ষের মাঝে যেমন জীবনের ছন্দ খুঁজেছেন, তেমনি মস্কোর স্মৃতি বা চেন্নাইয়ের নিঃসঙ্গতায় খুঁজে পেয়েছেন অস্তিত্বের আদিম হাহাকার।
বইটির নাম ‘দৌড়’ সার্থক হয়েছে কারণ প্রতিটি পংক্তিতে এক নিরন্তর ধাবমানতা দৃশ্যমান- কেউ ছুটছে ক্ষমতার পেছনে, কেউ বেঁচে থাকার তাগিদে, আবার কেউবা কেবলই এক ‘মায়ামৃগ’ ধরার নেশায়। বিশেষ করে বার্ধক্য, জরা এবং আসন্ন মৃত্যুর যে শঙ্কা কবি চিত্রিত করেছেন, তা অত্যন্ত মানবিক ও স্পর্শকাতর। করোনাকালের অস্থিরতা এবং সেই সময়ের অমানবিকতা কবিকে ব্যথিত করেছে, যা তাঁর কবিতায় প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির প্রতি মানুষের যে অকৃতজ্ঞতা এবং ‘উপচে পড়া’ ভোগবাদের যে চিত্র তিনি এঁকেছেন, তা আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত করে। অন্যদিকে, তাঁর ‘অণু কবিতা’গুলোতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে জীবনের বিশাল দর্শন ব্যক্ত হয়েছে। সহজ-সরল ও মেদহীন ভাষায় লেখা এই কবিতাগুলো কেবল কবির ব্যক্তিগত অনুভ‚তি নয়, বরং বিমর্ষ এক সভ্যতার দর্পণ, যেখানে মানুষ সব পেয়েও শেষাবধি নিজেকে ‘সর্বহারা’ হিসেবে আবিষ্কার করে। ‘দৌড়’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি সময়ের এক প্রামাণ্য দলিল যা পাঠককে যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এক নিভৃত ভাবনার জগতে নিয়ে যায়।
জন্ম ৩রা ফেব্রুয়ারি, ১৯৬০ সাল, ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানাধীন জয়পুর গ্রামে। চিত্তরঞ্জন পাল ও ফুলু রাণী পাল- দম্পতির প্রথম সন্তান। প্রথমে জয়পুর প্রাইমারি ও সরোজিনী জুনিয়র হাই স্কুলে, পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল মডেল হাই স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, আইপিজিএমএন্ডআর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করেন।
সরকারি চাকরিজীবী হিসাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ করেছেন এবং স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজের শিশু নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৭৬ সালে ছড়া দিয়ে লেখালেখি শুরু। তারপর কবিতা, গান, ছোটগল্প, চিকিৎসা বিষয়ক নিবন্ধ ইত্যাদি লিখেছেন, সেগুলো থেকে কিছু কিছু নানা সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
বিচিত্র স্বাদের বই পড়া ও ভ্রমণ তার প্রিয় বিষয়। স্ত্রী কাবেরী পাল এবং একমাত্র কন্যা ডা. অনন্যা পাল।