শিশুদের মনে থাকে বিশাল কল্পনার জগৎ। বড় হতে হতে মানুষ সেই জগত হারিয়ে ফেলে। তাই শিশুদের সাথে খুব নিবিড়ভাবে মিশতে হয়। তার কথা, কাজ, ব্যবহার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তবে তার জগতের কিছুটা খোঁজ পাওয়া যায়। তখন তার মনের চাহিদা অনুযায়ী কিছু বলা যায়।
শিশুরা সরল। তাই বলে সে সবার সব কথা অকপটে গ্রহণ করে নেবে, তা না। শিশু মনের উপযোগী করে গল্প বললে তবেই সে মন দিয়ে শুনবে। এটা নিয়ে ভাববে। মনেও রাখবে।
শিশুর শৈশব গঠনে শিশুকে গল্পের মধ্য দিয়ে তাকে চিন্তা করার সুযোগ দিতে হবে। যাতে সে নিজেই বুঝতে পারে কোন কাজটি সে করবে আর কোনটি করবে না।
পরিবেশ শিশুর মনের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। শৈশব থেকে নিজের অজান্তেই নিজেকে নিয়ে সে সেই দিকেই অগ্রসর হতে থাকে, যা সে দেখে এবং ভাবে। তাই সুন্দর পরিবেশ, সুন্দর স্বপ্ন তাদের সামনে এনে দেয়া বড়দের দায়িত্ব। আজকের ছোট্ট শিশু একদিন পরিবার, দেশ ও জাতির অভিভাবক হবে। কেমন চাই আমরা তাদের ও আমাদের ভবিষ্যৎ? কীভাবেই বা আমাদের চিন্তার সাথে তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারি? ভাবতে হবে।
শিশু ও কিশোরদের জন্যে গল্প লেখা সহজ নয়- কারণ এখানে কল্পনা, ভাষা ও নৈতিকতার মধ্যে সূক্ষè ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। মাহবুবা ফারুক সেই চ্যালেঞ্জটি দক্ষতার সাথেই গ্রহণ করেছেন তাঁর গল্পগ্রন্থ “গল্পে গল্পে শিখি”তে। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প যেন একেকটি ছোট্ট জীবনের পাঠশালা। প্রকৃতি, মানুষ, পশু-পাখি এবং পারিবারিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে লেখক এমন সব গল্প নির্মাণ করেছেন, যা শিশুমনের সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপন করে। গল্পগুলো কেবল আনন্দ দেয় না, বরং ধীরে ধীরে পাঠকের মনে নৈতিক বোধ, সহমর্মিতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপন করে।
“সুন্দর ও সুখী গ্রাম”, “মিলেমিশে থাকার আনন্দ”, “অহংকার ভালো নয়”, কিংবা “ধূর্ত শেয়াল ও নির্বোধ হাতি”- এই গল্পগুলোতে পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক ঐক্য, অহংকারের পরিণতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। সংলাপভিত্তিক গল্প বলার ভঙ্গি পাঠকের কৌত‚হল ধরে রাখে এবং শিশুরা সহজেই চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে। এই বইয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো- গল্পের ভেতর দিয়েই শিক্ষা এসেছে স্বাভাবিকভাবে। শিশুদের “কী করা উচিত” তা জোর করে না বলে, গল্পের পরিণতির মাধ্যমে নিজে নিজেই ভাবতে শেখায় বইটি।
সব মিলিয়ে “গল্পে গল্পে শিখি” একটি হৃদয়ছোঁয়া, শিক্ষামূলক ও সময়োপযোগী শিশুকিশোর গল্পগ্রন্থ। পরিবার, স্কুল ও গ্রন্থাগারের জন্য এটি একটি মূল্যবান সংযোজন। যারা চান শিশুরা গল্প পড়ে আনন্দের পাশাপাশি ভালো মানুষ হয়ে উঠুক- এই বই তাদের জন্যে নিঃসন্দেহে উপযুক্ত।
বই পড়া, মাঠে খেলতে যাওয়া, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভ্রমণের প্রতি আগ্রহী হলে প্রযুক্তির আসক্তি থেকে নিজেরাই সরে আসবে। মোবাইল ফোন অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করে এটা ওরা বুঝতে পারবে। আমরা শিশুদেরকে দায়িত্বশীল ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি। এটি আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। আশা করি একদিন আমরা সফল হবো।