পাশ্চাত্য সভ্যতার উন্মেষের পূর্বে অর্থাৎ মধ্যযুগে ইউরোপ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বন্ধ্যাত্বে আচ্ছন্ন ছিল। পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা একে অন্ধকার যুগ (উধৎশ অমব) নামে চিহ্নিত করেন। তখন ইউরোপের ক্ষমতাধর পোপ-পাদ্রীদের হাতে জ্ঞান পিপাসু বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও প্রবোদ্ধাগণ নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হন। কেউ কেউ নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছেন। কিন্তু মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বের চিত্র ছিল ভিন্ন রকম। মুসলিম রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে মুসলিম বিজ্ঞানী দার্শনিক ও সমাজ চিন্তকগণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে ইউরোপ তথা সারা বিশ্বকে আলোকিত করেছেন। বস্তুত ইউরোপ তথা প্রতীচ্য যখন মূর্খতা ও বর্বরতার অতল তলে নিমজ্জিত ছিল, তখন মুসলিম জগতের বাগদাদ, কর্ডোভা, টলেডো, কায়রো জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-ভব্যতার কেন্দ্র হিসেবে প্রোজ্জল ছিল। খ্রিস্টান ইউরোপ মুসলিম উদ্ভাবনী চিন্তা-চেতনা ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ভিতেই গড়ে তোলে পাশ্চাত্য সভ্যতা। মুসলিম বিজ্ঞানীদের উত্তরসূরী হলেন বেকন, কেপলার, নিউটন, আইনস্টাইন প্রমুখ বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী। শুধু কি তাই, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস ইত্যাদি সকল বিষয়েও পাশ্চাত্য প্রবোদ্ধারা মুসলিম পণ্ডিতদের কাছে ঋণী। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, মুসলিম সভ্যতার এই হিরন্ময় কীর্তির কথা আঠার শতক পর্যন্ত ইউরোপীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত ছিল। এর জন্যে দায়ী ইউরোপীয় পণ্ডিতদের জাতিগত বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক ও অনুদার দৃষ্টিভংগি। অত্যন্ত বেদনার্ত চিত্তে বলতে হয়, এমন গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও আমরা মুসলিমরা এ সম্পর্কে বেখবর। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুসলিম কীর্তির এই স্বর্ণালী অধ্যায়টি উপস্থাপন করার লক্ষ্যে ‘কালজয়ী মুসলিম সভ্যতা’ গ্রন্থখানির অবতারণা।