কবিতা মূলত আত্মার এক নির্জন কথোপকথন। যখন শব্দগুলো অভিজ্ঞতার রসে জারিত হয়ে কলমের ডগায় উঠে আসে, তখন তা আর কেবল লিপি থাকে না-হয়ে ওঠে এক একটি জীবন-দর্শন। কবি অনিরুদ্ধ মাহমুদের 'বাসী রঙের সাজে হেঁটে যাওয়া শহর' তেমনি এক অনুভবের কাব্যগ্রন্থ যেখানে শব্দ আর নীরবতা হাত ধরাধরি করে হেঁটে গেছে এই নাগরিক অরণ্যের অলিগলিতে।
এই কাব্যগ্রন্থটির প্রতিটি কবিতা যেন এক একটি চিত্রকল্প। কবি অবিরুদ্ধ মাহমুদ এখানে কখনো প্রেমিক হিসেবে বিরহের নীলকণ্ঠ পান করেছেন, কখনো নাগরিক যন্ত্রণার নিস্পৃহ দর্শক হয়েছেন, আবার কখনো সময়ের প্রয়োজনে গর্জে উঠেছেন দ্রোহের দাবানল হয়ে। বইটির বিন্যাসই বলে দেয় কবির ভাবনার পরিধি কতটা বিস্তৃত। নাগরিক প্রেম থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনের আর্তনাদ কিংবা আবু সাঈদের মহাকাব্যিক আত্মত্যাগ-সবকিছুই কবির লেখনীতে অনন্য এক মাত্রা পেয়েছে।
বইটির চারটি অংশ যেন জীবনের চারটি ঋতু। প্রথম অংশে নাগরিক হৃদয়ের গোপন রক্তক্ষনাণ ও প্রেমের মায়াবী আবেশ পাঠককে মোহাচ্ছন্ন করবে। দ্বিতীয় অংশে সমকালীন দ্রোহ ও রাজনৈতিক সচেতনতা আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তৃতীয় অংশে এসে প্রকৃতি ও জীবনদর্শনের যে নির্ভার প্রকাশ, তা আমাদের শেখায় পাহাড়ের মতো অটল হতে আর নদীর মতো বহমান থাকতে। সবশেষে, অনুভূতির অনুকণাগুলো যেন সেইসব ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা, যা পাঠ শেষেও মনের বারান্দায় এক অবিরাম রেশ রেখে যায়।
বাসন্তী রঙে সেজে থাকা এই যান্ত্রিক শহরটির আড়ালে যে কত হাহাকার আর কত দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, কবি অবিরুদ্ধ মাহমুদ অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে সেই ধূসর গল্পগুলোকে শব্দের রঙে রাঙিয়েছেন। প্রতিটি পঙক্তিতে ফুটে উঠেছে অস্তিত্বের সংকট আর উত্তরণের ব্যাকুলতা।
এই কাব্যযাত্রা সফল হোক। বাসন্তী সাজে সাজা এই শহরের ভিড়ে পাঠকেরা তাদের হারানো সুরটি এই বইয়ের পাতায় খুঁজে পাবেন-এমন প্রত্যাশা করা মোটেই অত্যুক্তি হবে না। এই কাব্যগ্রন্থটি পাঠকদের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটবে বলেই আমার বিশ্বাস।
অবিরুদ্ধ মাহমুদ-নামের যশে নিজেকে না খুঁজে বরং আত্মানুসন্ধানে মগ্ন এক শব্দশ্রমিক। নিজেকে তিনি ভাবেন এক চঞ্চল তরঙ্গ, যাকে প্রতিনিয়ত ছুঁয়ে যায় বিষন্ন মেঘলা বাতাস। কখনো পাহাড়ের অখণ্ড নীরবতায় দাঁড়িয়ে তিনি শোনেন অলিখিত কোনো মহাকাব্য, কখনো বা নদীর অবাধ্য যোতে মিশিয়ে দেন নিজের মন। সমুদ্রের নোনা জল আর উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে তিনি খুঁজে পান জীবনের আদিম ছন্দ। প্রকৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগ অতি গভীর। শিউলির শুভ্রত্য আর শিমুল-পলাশের রক্তিম বসন্ত তাঁর সন্তায় দোলা দেয়। সবুজের অরণ্যে তিনি হারিয়ে যেতে ভালোবাসেন, আর টিনের চালে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দে খুঁজে পান কাব্যের নিগূঢ় সুর। স্মৃতির সুবাস মাখ্য সুগন্ধি আর মাটির কাছাকাছি জীবনই তাঁর পরম আশ্রয়। মানুষকে ভালোবাসার এক সহজাত তাড়না তাঁর ভেতর প্রবহমান। ভুল হলে ক্ষমা চাইতে জানেন তিনি। আসলে, নিজের ভুল মেনে নেওয়াটা বড় সাহসের ব্যাপার। আর এই সাহসটাই তাকে মানুষের মাঝে মানুষের আরো কাছাকাছি নিয়ে যায়। তিনি জানেন, মানুষ হওয়াটা সহজ নয়, তবুও মানুষ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ: একক কাব্যগ্রন্থ: খানিক অন্যরকম, কাজলা মেয়ে হরিণী চোখ সম্পাদিত গ্রন্থ: জ্যোত্মা জলের কাব্য যৌথ কাব্যগ্রন্থঃ বাসন্তী, কাব্যের হাতছানি, বিষাদের এই সমকাল, সহমর্মিতার সংবেদন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর সৃজনশীল লেখা নিয়মিত পাঠক সমাদর পেয়ে আসছে।