বাঙালি জাতিসত্তা গঠনের ইতিহাস তিন হাজার বছরের অধিক প্রাচীন হলেও বাঙালির রাষ্ট্রগঠন চেষ্টার শুরুও প্রায় দেড় হাজার বছর আগের। ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্ক যখন প্রথম রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেন তা ব্যর্থ হয়েছিল। আর তার ব্যর্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, কারণ তখনো বাঙালি জাতি প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি স্বাধীন জাতি হিসেবে রাষ্ট্র গঠনের জন্য। বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস যেমন তিন হাজার বছর আগে শুরু, তেমনি বাঙালির রাষ্ট্রগঠন চেষ্টাও বিচ্ছিন্নভাবে হলেও প্রায় দেড় হাজার বছর আগে শুরু হয় শশাঙ্কের মাধ্যমে। রাজা শশাঙ্ক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্নযাত্রা শুরু করেছিলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে তা বাস্তবরূপ লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করেন তার আগে মূলত বাঙালির রাষ্ট্রগঠন ধারণা ততটা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। তখন তা সীমাবদ্ধ ছিল ঔপনিবেশিক শাসকদের শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের মধ্যে। বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনে ও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
চৌষট্টির দাঙ্গা মানুষের মধ্যে যে অভিজ্ঞতা ও চেতনাবোধের জন্ম দেয়, সেই অভিজ্ঞতা ও চেতনা বাঙালিকে লক্ষ্য স্থিরে সাহায্য করে। আর সেই লক্ষ্যই যে তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিপূর্ণতা দেয়, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। যদিও দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধর্ম নিরপেক্ষ রূপটিকে ধর্মহীনতার আবরণ দিতে সদা সচেষ্ট থেকেছে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সাম্প্রদায়িক শক্তি পরাভূত হয়েছে। বাঙালি তার নিজস্ব সত্তা নিয়ে, স্বমহিমায় স্বকীয়ভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা ও বোধের কারণে বাঙালি যেমন বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে তেমনি এই চিন্তা-চেতনা ও বোধের অভাবে দ্বিজাতিতত্ত্ববাদীরা তাদের তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামের জোড়াতালি মার্কা একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত তা আদিরূপে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। তারা পাকিস্তানকে অবিকৃতভাবে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে সকলেই যার যার সঠিক স্থানে অবস্থান নিয়েছে।
এস. এম. সারওয়ার মোর্শেদ তার ’চৌষট্টির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ গ্রন্থে সাম্প্রদায়িকতার প্রতিহিংসামূলক ও ধ্বংসাত্মক শক্তির পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িকতার সম্প্রীতিমূলক ও সৃজনশীল দিকটিকে বারবার বলার ও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রচ্ছন্নভাবে বলার চেষ্টা করেছেন, যদি ইংরেজরা তাদের ’ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি এখানে কার্যকর করতে সক্ষম না হতো, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী যে চেতনা বাঙালি মানসে ’৬৪-র দাঙ্গায় দানা বেঁধেছিল তা যদি অতীতেও প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকত এবং তা বাঙালি সম্প্রদায় থেকে অন্যান্য ধর্মীয় ও ভাষাভাষী ও নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সমভাবে সঞ্চারিত হতো, তবে ভারতবর্ষকে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গুটিকতক দুর্বল রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে হতো না। ভারতবর্ষ তার অতীত ঐতিহ্য ও শক্তি নিয়ে এক অভিন্ন পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হতো। যে লক্ষ্য ও অভিযাত্রায় আজ ভারত তার সহযাত্রীদের পেছনে ফেলে এককভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
এস. এম. সারওয়ার মোর্শেদ তার এই গ্রন্থে সব সময়ই একটি বার্তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তা হলো উপমহাদেশবাসীকে অসাম্প্রদায়িক বোধ-বুদ্ধি যতখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত, সাম্প্রদায়িক বোধবুদ্ধি, ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডুকতা ততখানিই পশ্চাদবর্তী করেছে; পিছিয়ে দিয়েছে। গ্রন্থটি পড়ে পাঠক এই সত্যটিকে উপলব্ধি করতে যেমন সক্ষম হবেন, তেমনি উপমহাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও সম্প্রীতির সঙ্গে পরিচিত হবেন, যা তাদের মননকে ঋদ্ধ করবে।