ব্রাম স্টোকার বিশ্বসাহিত্যে মূলত ড্রাকুলা–র স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর সাহিত্যজগৎ ছিল বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত। ভিক্টোরিয়ান যুগের সমাজ, মানবমন, সময়ের টানাপোড়েন ও কিংবদন্তিকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নানা রঙে, নানা ঘরানায়। এই গল্পসংকলন সেই বহুরূপী স্টোকারকেই পাঠকের সামনে তুলে ধরে।
এখানে যেমন রয়েছে রহস্য ও অতিপ্রাকৃতের শীতল ছায়া, তেমনি আছে মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ, সামাজিক ব্যঙ্গ, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, রোমাঞ্চকর ঘটনা ও আবেগঘন সম্পর্কের গল্প। কোনো গল্পে অজানার ভয় ধীরে ধীরে গ্রাস করে মানুষকে, আবার কোনো গল্পে মানুষের নিজের লোভ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা ভুল সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে নিয়তির নির্মম পরিহাস, আবার কোনো গল্পে মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতিই যেন গল্পের প্রাণ হয়ে ওঠে।
স্টোকার কখনো পাঠককে নিয়ে যান ভৌতিক অভিজ্ঞতার গহ্বরে, কখনো আবার দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মুহূর্ত থেকেই সৃষ্টি করেন গভীর নাটকীয়তা। তাঁর গল্পে প্রেম আছে, অনুশোচনা আছে, কৌতুকের হালকা স্পর্শও আছে এবং আছে তাঁর সময়ের সমাজব্যবস্থার স্পষ্ট প্রতিফলন।
এই সমগ্রের গল্পগুলো কেবল ভয় বা রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে না; এগুলো প্রশ্ন তোলে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা, সম্পর্ক এবং অদৃশ্য শক্তির প্রতি মানুষের চিরন্তন আকর্ষণ নিয়ে। শৈল্পিক ভাষা, দৃঢ় নির্মাণশৈলী ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার মাধ্যমে স্টোকার পাঠককে নিয়ে যান এক অনন্য সাহিত্যভ্রমণে—যেখানে প্রতিটি গল্প আলাদা স্বাদ নিয়ে উপস্থিত হয়।
ব্রাম স্টোকার-এর লেখা সকল ছোটো ও বড়ো গল্প দিয়ে সাজানো এই গ্রন্থ তাই শুধু ভৌতিক গল্পপ্রেমীদের জন্য নয়; রহস্য, মানবিক নাটক, সমাজচিত্র ও মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্যের পাঠকদের জন্যও এক সমৃদ্ধ পাঠভাণ্ডার।
ব্রাম স্টোকার পুরাে নাম আব্রহাম ব্রাম স্টোকার। আইরিশ এই উপন্যাসিক ও গল্পকার গােটা পৃথিবীর কাছে বিখ্যাত। ড্রাকুলা'র লেখক হিসাবে। জন্ম ১৮৪৭ সালের ৮ই নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে।। ছােটোবেলায় দীর্ঘকাল কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে। শয্যাশায়ী ছিলেন। মায়ের কাছে নানান রূপকথা আর কিংবদন্তি শুনে মূলত ভৌতিক সাহিত্যে আগ্রহ জাগে। তার। ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত হয় উনার প্রথম উপন্যাস। ‘দ্য প্রিমরােজ প্যাথ'। পঞ্চদশ শতকের ওয়ালাচিয়ার। আলােচিত-সমালােচিত রাজকুমার ভাদ তেপস। ড্রাকুলা বা ভাদ দ্য ইম্পেলারকে নিয়ে যুবক বয়স। থেকেই প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তার। জে. সারিভন লে। ফানুর ‘কামিলা' পড়ে সর্বপ্রথম ভ্যাম্পায়ার ফিকশন। লেখার ইচ্ছা জাগে তার মনে।। ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয় উনার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস 'ড্রাকুলা' যেখানকার প্রধান চরিত্রটিকে তিনি। গড়ে তুলেছিলেন ভাদ দ্য ইম্পেলারের অনুকরণে। যদিও শুরুতে বইটি তেমন সাড়া ফেলেনি। ব্রামের মৃত্যুর কিছু বছর পর এই গ্রন্থটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং একসময় বিশেষজ্ঞরা এটিকে কালজয়ী। গ্রন্থ হিসাবে মেনে নেন। অতিপ্রাকৃত সাহিত্যেও সবচেয়ে বিখ্যাত বই এটিই। প্রায় এক ডজন বইয়ের লেখক তিনি, তবে ড্রাকুলার। আকাশছােয়া জনপ্রিয়তার কারণে সেগুলাে নিয়ে আর। তেমন আলোচনা হয় না। তবে উনার ‘দ্য লেডি অফ। দ্য শ্রাউড', 'দ্য মিস্ট্রি অফ দ্য সি’, ‘দ্য স্নেকস পাস বইগুলাে কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। এছাড়া ‘দ্য জুয়েল অফ সেভেন স্টারস’ আর ‘দ্য লেয়ার অফ। দ্য হােয়াইট ওয়ার্ম' উপন্যাস দুটিও পঞ্চাশের দশকের। পর মোটামুটি জনপ্রিয়তা পায়।। ১৯১২ সালের ২০শে এপ্রিল ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান হরর সাহিত্যের এই মহান লেখক।