শান্তিপুর আর সোনাঝুরির শান্ত, সবুজ প্রকৃতির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের শিকার হয় দুটি নিরীহ জীবন—ধর্ষিত হয় কিশোরী লতা আর নির্মমভাবে খুন হন দোকানদার আলীম। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো বিচ্ছিন্ন অপরাধ মনে হলেও, তরুণ এবং নির্ভীক অনুসন্ধানী সাংবাদিক আরিফ চৌধুরী বুঝতে পারেন, এই ঘটনাগুলো এক বিশাল ষড়যন্ত্রের সামান্য ইঙ্গিত মাত্র। তিনি যখন এই সত্য উন্মোচনের জন্য কলম ধরেন, তখন তিনি নিজেও জানতেন না যে, তিনি আসলে এক অজেয়, ক্ষমতাবান দানবের অদৃশ্য সাম্রাজ্যের দরজায় আঘাত হেনেছেন।
এই দানবের নাম শফিকুর রহমান— দেশের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, যার ক্ষমতার জাল ছড়িয়ে আছে প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে মিডিয়ার অন্ধকার জগৎ পর্যন্ত। তার ইশারায় আইন পরিণত হয় খেলনায়, সত্যকে কবর দেওয়া হয় নির্দ্বিধায়, আর ন্যায়বিচার পরিণত হয় এক নিষ্ঠুর প্রহসনে। আরিফের এই অসম লড়াইয়ে যখন সবাই তাকে পাগল ভাবছিল, তখন তার পাশে এসে দাঁড়ায় এক অসম্ভব সাহসী, বিবেকবান প্রবীণ সাংবাদিক তাসনিম, প্রযুক্তিবিদ রাহাত, মানবাধিকার কর্মী নাজিবা এবং দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা ঐশী, যিনি তার গ্ল্যামারের জগৎ ছেড়ে সত্যের জন্য নিজের সবকিছু বাজি রাখতে প্রস্তুত।
শুরু হয় এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই। একদিকে শফিকুর রহমানের অর্থ, পেশিশক্তি আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নারকীয় প্রদর্শনী; অন্যদিকে আরিফের কলম, ঐশী আর কিছু সাধারণ মানুষের অদম্য সাহস। কীভাবে প্রমাণ লোপাট করা হয়, আদালতে কীভাবে মিথ্যা সাক্ষীর ভিড় তৈরি করে সত্যকে ধূলিসাৎ করার চেষ্টা চলে, কীভাবে মিডিয়াকে ব্যবহার করে চরিত্র হননের নোংরা খেলা হয়, আর কীভাবে আরিফ ও তার সঙ্গীদের ওপর নেমে আসে সরাসরি মৃত্যুর হুমকি—তার প্রতিটি অধ্যায় পাঠককে এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি করে।
কিন্তু যখনই মনে হয় অন্ধকার সবকিছু গ্রাস করে ফেলেছে, ঠিক তখনই জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ। আরিফের প্রতিবেদন আর ঐশীর আহ্বানে জেগে ওঠে দেশের মানুষ। যে লতা একদিন লজ্জায়, অপমানে আত্মহত্যার কথা ভেবেছিল, সে—ই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রতীক। যে গ্রামের মানুষ ভয়ে নিজেদের দরজা বন্ধ করে রাখত, তারাই গড়ে তোলে প্রতিরোধের দুর্গ। শান্তিপুর থেকে শুরু হওয়া সেই ছোট আন্দোলন একসময় পরিণত হয় এক বিশাল গণজাগরণে, যা কাঁপিয়ে দেয় শফিকুর রহমানের ক্ষমতার মসনদ।
‘আঁধার পেরিয়ে আলো’ শুধু একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি সাহস, সততা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত শক্তির এক মহাকাব্য। এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় রয়েছে ইন্সপেক্টর জামানের মতো সিস্টেমের ভেতরে থাকা বিবেকবান মানুষের নৈতিক যুদ্ধ, ব্যারিস্টার সজলের মতো আদর্শবান আইনজীবীর তীক্ষè মেধার লড়াই আর আরিফ ও ঐশীর মধ্যে গড়ে ওঠা এক না—বলা, গভীর ভালোবাসার স্নিগ্ধ কাহিনী।
অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, সত্যের আলো একদিন জ্বলবেই। এটি এমন এক যাত্রার বিবরণ, যা প্রমাণ করে, রাত যত দীর্ঘই হোক না কেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এক নতুন সূর্যোদয় অবশ্যম্ভাবী। আপনি কি এই রুদ্ধশ্বাস এবং অনুপ্রেরণাদায়ক যাত্রার সঙ্গী হতে প্রস্তুত?