কাল রাতে কাকে দেখলাম আমি? মুক্তা ভাই! হ্যাঁ, মুক্তা ভাই-ই তো। ভুল হবার কথা নয়। তেরো বছর পর দেখলাম। মনের ভেতর আঁকা ছবি কি ভোলা যায়?
মাঝরাতে প্রায়ই আমার ঘুম ভেঙে যায়। পরে আর ঘুম আসতে চায় না। তখন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। রাতের নিস্তব্ধতা, তারা ভরা আকাশ, দূরের রাস্তায় ছুটে যাওয়া গাড়ির হলুদ লাল বাতি দেখতে আমার ভালো লাগে।
গতকালও দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম মেইন গেট দারোয়ান খুলে দিলে একটা মাইক্রো এসে ঢুকল। আমি একটু আগ্রহ নিয়ে তাকালাম। এত রাতে কে এল?
কয়েকটা বাড়ি নিয়ে আমাদের ক্যাম্পাস, মাঝখানে একটা ছোটখাটো খোলা জায়গা, একটাই গেট। আমাদের বাড়িটা ভেতরের দিকে, মুক্তা ভাই যে বাড়িটায় ঢুকল সেটা মাত্র ২৫ গজ দূরে একদম গেটের কাছে। সব বাড়ির মুখেই একটা লাইট জ্বলে আর গেটে দুইটা। রাতের অন্ধকারে এই লাইটের আলোতে মোটামুটি ভালোই দেখা যায়।
মুক্তা ভাইয়ের কোলে ২-৩ বছরের ঘুমন্ত মেয়ে বাচ্চা, সাথে মনে হয় বউ আর তিনটা বড় সাইজের ব্যাগ। বাকি রাত আমার আর ঘুম হলো না।
সকালবেলা ওই বাসার সামনে দিয়ে বাচ্চাদের স্কুলে যাবার সময় খুব কষ্টে যেন পা টেনে নিয়ে গেলাম। সারা দিন কেটে গেল, কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার চোখ চলে গেছে। কোন ফ্ল্যাটে উঠেছে? একবার কি বের হবে? আমাকে কি দেখতে পাবে? আমার মন অস্থির কিন্তু বাইরে বড় নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম, মুখে কোনো কথা নেই, নিজের কাজগুলো কেমন এলোমেলো হতে লাগল।
বাচ্চাদের স্কুল থেকে নিয়ে এলাম, সন্ধ্যায় রাশেদ অফিস থেকে ফিরে এল বাসায়। আমার কোনো দিকেই মন নেই। শুধু মুক্তা ভাইয়ের কথাই মনে পড়তে থাকল।
মুক্তা ভাই আমার সিনিয়র। একই সাবজেক্ট ছিল আমাদের। ভীষণ জিনিয়াস স্টুডেন্ট ছিলেন আর আমি ছিলাম খুব সাধারণ মানের ছাত্রী। সবার জীবনে একটা গল্প থাকে, সেই গল্প শেষ হয় বিচ্ছেদের তিক্ততায় অথবা ভালোবাসার মিলনে। মুক্তা ভাইয়ের সাথেও আমার একটা গল্প তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেই গল্পটা এক অধুরা গল্প।
খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে আমি। শুধু সাধারণ নয় অতি সাধারণ, যেখানে আব্বার টানাটানি করে সংসার চালাতে গিয়ে মাস শেষে হাত শূন্য হয়ে যেত।
পিঠাপিঠি তিন বোন আমরা, আমি মেজ। সবাই বলত আমরা তিন বোনই সুন্দরী। আমাদের কোনো শখ আহ্লাদ ছিল না, থাকতে নেই। এক রোজার ঈদ ছাড়া আব্বা আমাদের বাড়তি কোনো কাপড়চোপড় দিতে পারত না। এক বোনের বই আরেক বোন পড়তাম। স্কুলজীবন এভাবেই পার হলো।
এই সমাজে আমাদের মতো এমন পরিবার বোধ হয় বেশি, যারা অভাব লুকিয়ে রাখতে একটা ঠুনকো গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলে। খুব কম দামি পণ্যে নিজেদের ঘষেপিষে রাখতাম, যাতে ভেতরের অপূর্ণতা কেউ বুঝতে না পারে।
কলেজে ওঠার পর আমরা এমব্রয়ডারি ও সেলাইয়ের অর্ডারি কাজ করে নিজেদের বাড়তি প্রয়োজনটুকু মিটাতাম। এই ছিল আমাদের জীবন।
এমন জীবনে আসলে প্রেম হয় না, প্রেম করাও যায় না। লেখাপড়া করে একটা মোটামুটি ধরনের চাকরির জন্য নিজেকে উপযুক্ত করা আর ভালো পাত্রের জন্য সুনিপুণ গৃহিণী হওয়ার চেষ্টা ছিল কেবল।
তবে প্রেম কখনো করাঘাত করেনি তা নয়। বরং সুন্দরী বলে অনেকেই ভালোবাসার ডালি নিয়ে আসতে চাইত। আমি নির্বিকার থাকতাম তখন। ভাবতাম প্রেম হলো বিলাসিতা, এসব আমাদের মানায় না।
বান্ধবীদের প্রেম করা দেখে কখনো মনে উথালপাতাল হওয়া বা কারো চোখে চোখ রেখে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হতো না যে তা-ও নয়। ইচ্ছেগুলো চোখের বৃষ্টিতে ভিজিয়ে চলে যেত যেন কোথাও।
সেই আমি ভার্সিটিতে এসেও বাস্তবতার কাঠিন্যের কাছে নিশ্চুপ নীরবতা পালন করে গেছি। অনেকটাই মুখ লুকিয়ে চুরিয়ে থাকার মতো। থার্ড সেমিস্টারে এসে পড়াশোনা কঠিন মনে হতে লাগল, স্ট্যাটসের কিছুই বুঝি না। পাস করতে হলে ভালো মার্কস পেতে হবে। এক সিনিয়র আপুর সাথে কথা বলতেই উনি মুক্তা ভাইয়ের হেল্প নিতে বলল।
মুক্তা ভাইয়ের সাথে পরিচয় আগেই হয়েছিল। উনি নিজেই যেচে এসে কথা বলেছিলেন,
তুমি রুবাইয়াত, তাই না?
জি। তুখোড় ছাত্র বলে সবার মুখে মুখে উনার নাম আগে শুনেছি, মুখ চিনতাম।
কোথায় থাকো? হলে?
জি না, মিরপুর বাসা।
পড়াশোনায় কোথাও সমস্যা হলে আমাকে বলতে পারো হেল্প করব।
আমি ঘাড় নাড়লাম। আমার নাম কীভাবে জানল বা কী দরকার ছিল কথা বলার এটা নিয়ে মাথা ঘামালাম না।
মুক্তা ভাইকে দেখতাম সব সময় সেমিনার রুমে না হয় লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করছে, নতুবা টিচারদের রুমে গিয়ে কথা বলছে। বাঁ হাতে ধরা থাকত উনার বই-খাতা আর বুকপকেটে দুটো ইকোনো বলপেন। ইদানীং অবশ্য একটা ক্যানভাস কাপড়ের ব্যাগ দেখেছি কাঁধে। ভার্সিটির ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি করে, ঘোরাফেরা করে নয়তো রাজনীতি করে। মুক্তা ভাইকে এসবের কোনোটাই দেখিনি। কী অদ্ভুত! জিনিয়াসরা বোধ হয় পড়ালেখা ছাড়া কিছু বোঝে না মনে হয়।
একদিন অফ টাইমে মুক্তা ভাইয়ের খোঁজে সেমিনার রুমে বসে আছি, দেখি উনি উঁকি দিল, আমি হাত তুলে ডাকার আগেই উনি অদৃশ্য। বের হয়ে পেছন থেকে ডাকলাম, মুক্তা ভাই।
ডাক শুনেই হেসে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
কেমন আছো রুবাইয়াত?
জি ভালো, আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।
খুব জরুরি?
জি।
আমি একটু মোশতাক স্যারের রুমে যাচ্ছি। বেশি সময় লাগবে না। এসে কথা বলি?
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
ঠিক আছে আমি অপেক্ষা করছি।
আমি মোশতাক স্যারের রুমের সামনের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। দরকার তো আমারই অপেক্ষা করতে সমস্যা কি? কিন্তু উনি হেল্প করবেন তো? ডিপার্টমেন্টের সবার সাথেই দেখি বেশ আলাপচারিতা আছে। তাছাড়া উনি তো অনেক আগেই একবার বলেছিলেন তবুও মনে মনে একটা সংকোচ এসে দাঁড়াল, কারণ কখনো কারো কাছে যেচে এভাবে হেল্প চাইনি।
মিনিট পনের পরে মুক্তা ভাই স্যারের রুম থেকে বের হলেন। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,
তুমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছো, সেমিনার রুমে বসলেই পারতে।
না ঠিক আছে। স্যারের কাছে কি পড়া বোঝার জন্য গিয়েছিলেন?
আমি সহজ হবার চেষ্টা করলাম।
না। টিচারদের কিছু প্রজেক্ট থাকে সেগুলো করে দেয়ার চেষ্টা করি। তাতে আমারও কিছু শেখা হলো, উনাদেরও কাজটা হলো। আচ্ছা এবার বলো আমি তোমার কি হেল্প করতে পারি?
কিছু না বলে আমি মাথা নিচু করলাম এবার, সংকোচের সাথে লজ্জার ভিড়। আমার হাতের তালু ঘেমে উঠছে নার্ভাসনেসের কারণে। চোখ তুলে দেখলাম ভীষণ স্বচ্ছ দুটো চোখ নিয়ে মুক্তা ভাই আমার সামনে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে হাসিমুখে। উনি বোধ হয় বুঝতে পারছেন আমার অবস্থা। এভাবে কেউ তাকিয়ে হাসে? আশপাশের মানুষগুলো কী ভাববে? আমি হড়বড় করে বললাম,
মুক্তা ভাই আমার কিছু নোটস লাগবে?
শুধু নোটস?
আমি আসলে স্ট্যাটসের কিছুই বুঝতে পারছি না। অংকগুলো মাথায় ঢুকছে না। পাস মার্কস তুলতে পারব বলে মনে হয় না।
নোটস কাল নিয়ে আসব, আর অংকও বুঝিয়ে দেব। ঠিক আছে কাল দেখা হবে। বলেই উনি আর দাঁড়ালেন না। আমি উনার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
কথা বলার সময় মুক্তা ভাইয়ের চোখ আমার চোখকে যেন টেনে ধরেছিল। এমন চোখ কখনো চোখে পড়েনি আমার। আশ্চর্য ছেলেদের চোখ এমন হয়? বড় বড় চোখে কাজল কালো ঘন পল্লব, সাত সাগরের অতল গহিন গভীরতা! এই অসম্ভব মায়াবী চোখে কেউ কি কখনো প্রেমে পড়েনি? হঠাৎ এমন ভাবনা আমার মনে চলে এল। হতে পারে এমন অনেক কিছুই। কিন্তু তাতে আমার কি? নিজেকে আর সুযোগ দিলাম কোথায় কাউকে ভালো করে দেখার।
পরের দিন উনি সব নোটস নিয়ে এলেন একটা ফাইলে করে। খুলে দেখি কালো মুক্তা বলে কিছু আছে কিনা জানি না, কিন্তু লেখাগুলো যেন উনার নামের মতোই মুক্তোময়। মারাত্মক সুন্দর হাতের লেখায় এত সুন্দর সাজানো-গোছানো নোট জীবনে প্রথম দেখলাম।
জীবনের অনেক কিছুই প্রথম পর্ব বা পৃষ্ঠার মতো আকর্ষণীয় যা শেষ পৃষ্ঠায় চলে এলেও প্রথমের রেশটা বুকের মধ্যে সিলগালা হয়ে যায়।
দুপুরে ক্লাস শেষে মুক্তা ভাইয়ের কাছে স্ট্যাটস পড়া শুরু করলাম। বান্ধবীরা সব ঝাঁপিয়ে ধরল ‘কি রে মুক্তা ভাইয়ের কাছ থেকে খুব সুবিধা পাচ্ছিস মনে হয়, কিছু সুযোগ আমাদেরও দিস।’ ক্লাসের ছেলেরা আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের সর্বহারা চোখে। আমি মনে মনে হাসি ওদের অকুল ব্যাকুল ঈর্ষায়, তৃষ্ণায়।
লাঞ্চ আওয়ারের পর লাইব্রেরিতে ছেলেমেয়েরা কমই থাকে। কেবল যারা আসল পড়ুয়া তারাই পড়তে আসে। ক্লাস শেষ করে আমি চলে যেতাম লাইব্রেরিতে, দেখতাম মুক্তা ভাই আমার জন্য লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে সাথে করে নিয়েই উনি লাইব্রেরি রুমে ঢুকতেন। কখনো এমন হয়নি যে আমি গিয়ে উনাকে পাইনি। এই যে আমাকে অপেক্ষা করতে হতো না বিষয়টা আমার ভালো লাগত।
কেন এমন হতো? কেন মুক্তা ভাই অপেক্ষা করার সুযোগ দিত না তখন না বুঝলেও অনেক পরে বুঝেছিলাম।
লাইব্রেরির ভেতর কথা বলা নিষেধ, তাই উনি গলা নিচু করে আমাকে পড়া বোঝান। যার জন্য খুব কাছাকাছি ঝুঁকে বসতে হতো। মাথার ওপর ফ্যানের বাতাসে কখনো আমার সামনের ছোট চুলগুলো উড়ে পড়ত মুক্তা ভাইয়ের মুখে। উনি হেসে চুল সরিয়ে নিতেন। আমার চোখে পড়ত ঠোঁটের আড়ালে চিরল দাঁত, পুরুষালি গন্ধে কেমন মাদকতা অনুভব করতাম। আমার এত দিনের কঠিন তপস্যা ভাঙতে বসেছে বেশ বুঝতে পারছিলাম।