সাহিত্যকৃতি ও সম্মান
মোট চারটি উপন্যাস লিখেছেন হেমিংওয়ে। ১৯৫২ সালে দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসটি প্রকাশ পায়। সেই বছরে গ্রন্থটির জন্য হেমিংওয়ে সাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে এই গ্রন্থটির জন্য হেমিংওয়ে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, নোবেল কমিটি উপন্যাসটির স্মরণে লিখেছেন—‘‘His vigorous art and the influence of his style on the literary art of our times as manifested in his book The Old Man and the Sea.
হেমিংওয়ে উপলব্ধি করেছেন, মানুষ মাত্রই একা, নিঃসঙ্গ, তার চলার পথ বড়ই রুঢ়, তবুও নিরন্তর সংগ্রাম করে এগিয়ে যেতে হয় নিজের লক্ষ্যপূরণে। হয়তো সেই অসম জীবন সংগ্রামে সে যা চায় তা পায় না, হয়ে যেতে হয় গ্রিক ট্রাজেডির নায়ক। সেই জীবনসত্য দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসে কেশর দোলানো সিংহের স্বপ্নবিলাসী নায়ককে মনে করিয়ে দেয়।
আসলে এ উপন্যাসের নায়ক নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে বিশ্ববিধানকে লঙ্ঘন করেছেন। মানবজীবনের সেই নিগূঢ়তম জীবন-উপলব্ধি আলোচ্য উপন্যাসে নির্ভার ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। মাত্র তিন দিন তিন রাতের আখ্যান নিয়েই এ উপন্যাস। বড়শিবিদ্ধ মাছটাকে সময়ের সন্ধিক্ষণে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের মহোত্তম সৌন্দর্যের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করেছেন এ উপন্যাসের নায়ক। সেই মাছটাকে বধ করার জন্য তাঁর অনুভূতি, কাউকে ঐকান্তিকতার সঙ্গে ভালোবাসার পরে তাকে বধ করার মধ্যে কোনো পাপ নেই। তাঁর শেষতম অনুভব, প্রতিজ্ঞা পূরণে মানুষ ধ্বংস হয়ে যায় কিন্তু কখনো পরাজিত হতে পারে না। সন্ধ্যার আলো অন্ধকারে বসে সিংহের খেলা দেখা আসলে তাঁর শুশ্রূষার বিশল্যকরণী মাত্র।
সমুদ্র এখানে রূপক অর্থে ব্যবহৃত। এক অর্থে মানুষের জীবন সমুদ্রেরই সমতুল্য—কখনো উত্তাল তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ, কখনো শান্ত সমাহিত। সেই সমুদ্রের মূল স্রোতধারার বুক বেয়ে বিধিলিপিকে মেনে নিয়ে কখনো উজানে, কখনো ভাটার টানে মানুষকে এগিয়ে যেতে হয় জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে।
নিঃসঙ্গ সংগ্রামী জীবনে এ উপন্যাসের ব্যর্থ বুড়ো জেলে সান্তিয়াগো যেন মানবসুলভ সহানুভূতির চিরন্তন মডেল। তাঁর শক্তি ও শেষতম সক্ষমতায় একধরনের প্রচ্ছন্ন আশাবাদ ভীষণভাবে জাড়িত হয়েছে। ম্যানোলিন চরিত্রের মধ্য দিয়ে অতীত স্মরণ, বরণ ও বর্তমান অনুধ্যানে আমরা সান্তিয়াগোকে অভিনবরূপে আবিষ্কার করতে পেরেছি। ভাষাপ্রয়োগ হেমিংওয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব লুকিয়ে রয়েছে। তাঁর বাক্য একেবারেই নির্মেদ, অবশ্যই নির্ভার, আবার উপযুক্ত মাত্রায় সুমিত ও সংহত। বর্ণনায় কখনো প্রয়োজনের অতিরিক্ত গাঢ় রঙ ব্যবহার করেননি।
আজীবন খেয়ালি হেমিংওয়ে তাঁর নোবেল পুরস্কারের সমস্ত অর্থ ব্যয় করেছেন কোহিমার ধীবর পল্লীর মানুষের জন্য, পেয়েছেন সেই উদারতার এক অবিস্মরণীয় মূল্য। সীসা কুঁদে নির্মাণ করা হয়েছে হেমিংওয়ের যে আবক্ষ মূর্তি তা আজও প্রতিটা নৌকার প্রপেলারে সুশোভন শোভায় উজ্জ্বল।
ঔপন্যাসিক হাভানার নয় মাইল দূরে স্যান ফ্রান্সিসকো দ্য পাওলোতে পাহাড়ের উপর একটি খামারে বাস করতেন। হেমিংওয়ের সম্মানে কিউবা সরকার সেটাকে জাতীয় জাদুঘরের মর্যাদা দিয়েছেন। আজও সেখানকার আসবাবপত্র, কাগজপত্রাদি আগের মতো অবস্থানে রয়েছে। বন্ধ দরজা জানালার সার্সির ভেতর দিয়ে আগ্রহী দর্শনার্থীরা তা দেখে উপলব্ধি করতে পারেন, তাঁদের প্রিয় কিংবদন্তী মানুষটি কঠোর বাস্তব জীবনে ঠিক কেমন ছিলেন।
পাঠক বন্ধুদের কাছে বিনীত অনুরোধ, ভাষান্তরকে সার্থক করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি কাহিনির মোড়কে সাহিত্যের আস্বাদনকে যথাসম্ভব অক্ষুন্ন রেখে। আপনাদের আন্তরিক স্বীকৃতিতে রয়েছে আমার পরিশ্রমের সার্থকতা।
মুসা আলি