আমরা কেন শ্বাস নেই? এক কথায় উল্টর হলো বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু শ্বাস-প্রশ্বাস আসলে শুধু বেঁচে থাকার জন্যই নয়; জীবনের সঙ্গে এর এক গভীর রহস্যময় সম্পর্ক আছে। ছোটবেলায় আমি প্রায়ই অবাক হয়ে ভাবতাম— এত সহজ অথচ অবিশ্বাস্য এক প্রক্রিয়া! পরের দিনগুলোতে বিজ্ঞানের আলোয় বুঝলাম, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী, এমনকি গাছপালাও অক্সিজেন টেনে নিয়ে আবার ছেড়ে দিচ্ছে। জীবন আর শ্বাস যেন অবিচ্ছেদ্য দুই সঙ্গী।
হাই স্কুলে পড়ার সময় পরিচয় হলো রাজযোগের সঙ্গে। সেখানেই প্রথম শুনি “প্রাণায়াম” নামের এক আশ্চর্য চর্চার কথা। পরে জাদুকর পিসি সরকারের বই পড়ে জানলাম, নিয়মিত প্রাণায়াম মনের গভীর মনোযোগ জাগাতে পারে। ধীরে ধীরে খুলে গেল নতুন এক জগত— মস্তিষ্কের অদৃশ্য ক্ষমতা, চেতনার উচ্চতর স্তর, ধ্যানের অসংখ্য রূপ। গৌতম বুদ্ধের বিপাসনা থেকে শুরু করে আধুনিক নানা গুরুর উদ্ভাবিত ধ্যান পদ্ধতি একে একে জানতে চেষ্টা করেছি। ১৯৯৩ সালে সিলভা গুরু মাহি কাজির কাছ থেকে সিলভা গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করি; ১৯৯৫ সালে হোজে সিলভা থেকে আলট্রা মাইন্ড প্রোগ্রাম শেষ করি। পরে শ্রী শ্রী রবি শঙ্করের আর্ট অব লিভিং, সদগুরুর ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং, মহেশ যোগীর ট্রান্সসেন্ডেন্টাল মেডিটেশন— সবই শিখেছি, অনুশীলন করেছি, এখনও করছি।
তবে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার— ধ্যানের সুফল পেতে একসাথে এত পদ্ধতি শেখা জরুরি নয়। যেমন পানি খুঁজতে ছোট ছোট গর্ত অনেক খুঁড়লে ফল মেলে না; বরং এক জায়গায় গভীরভাবে খুঁড়লেই মিষ্টি জলের দেখা মেলে। তেমনি একটিমাত্র ধ্যানপদ্ধতি নিয়মিত চর্চা করলেই যথেষ্ট। আর ধ্যান আসলে চেষ্টা করে হয় না— ধ্যান ঘটে যায়। এটি এক ধরনের Art of Effortlessness. সদগুরুর কথায়, ফুলের ঘ্রাণ পেতে হলে গাছটিকে যত্ন নিতে হয়; গাছ ভালো থাকলে ফুল নিজেই ফোটে, সুবাস নিজে থেকেই ছড়ায়।
এই বই লেখার উদ্দেশ্য ঠিক সেখানেই। পাঠককে ধ্যান ও প্রাণায়ামের সহজ কিন্তু গভীর জগতে নিয়ে যাওয়া। এর উপকারিতা আজ বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত। আজকের চাপভরা, দ্রুতগতির জীবনে প্রতিদিন মাত্র ১০-২০ মিনিট ধ্যান ও প্রাণায়াম শরীর ও মন দুই-ই বদলে দিতে পারে।
আরিফ আহমেদ: কৌতূহলী মন ও চেতনার শিল্পী। কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা কেবল একটি পরিচয় বহন করেন না; তাঁরা একই সাথে হন প্রযুক্তিবিদ, শিল্পী এবং সাধক। আরিফ আহমেদ তেমনই একজন বহুমাত্রিক চিন্তানায়ক, যিনি এক হাতে ধরেন 3D অ্যানিমেশনের আধুনিক সফটওয়্যার, অন্য হাতে তুলি, আর মনে ধারণ করেন মহাবিশ্বের রহস্য।
১৯৯৫ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশের 3D অ্যানিমেশন জগতে এক পথিকৃৎ। তাঁর হাতে গড়া AAVA3D থেকে হাজারো শিক্ষার্থী আজ পেশাদার অ্যানিমেটর। অ্যানিমেশনকে তিনি শুধু শিল্প হিসেবে দেখেননি, এটিকে তিনি যুক্ত করেছেন বিজ্ঞানের সঙ্গে; যার প্রমাণ তাঁর লেখা Physics for Animation। বর্তমানে তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং অ্যাস্ট্রোফিজিক্স সেন্টারের পরিচালক। তাঁর স্বপ্নে দেখা প্ল্যানেটেরিয়াম এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে—যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এক নতুন দিগন্ত।
এখানেই শেষ নয়। আরিফ আহমেদ একইসাথে একজন বিজ্ঞান-অনুপ্রাণিত চিত্রশিল্পী। তাঁর ক্যানভাসে গ্যালাক্সি, নীহারিকা আর ব্ল্যাক হোল জীবন্ত হয়ে ওঠে—বিজ্ঞান ও শিল্পের এই মেলবন্ধন মানুষের কল্পনাকে জাগিয়ে তোলে। এই সবকিছুর কেন্দ্রে আছে তাঁর ধ্যান ও প্রাণায়ামের গভীর চর্চা। তিনি বিশ্বাস করেন, সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন মানুষকে শান্তি, সৃজনশীলতা ও জীবনীশক্তি দিতে পারে। এককথায়, আরিফ আহমেদ হলেন বিজ্ঞান, শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার এক বিরল সমন্বয় – যিনি বাইরের জগৎ (উদ্ভাবন ও কৌতূহল) এবং ভেতরের জগৎ (অন্তর্দেহিক শান্তি) দু’দিকেই আলো ছড়ান।