1 verified Rokomari customers added this product in their favourite lists
TK. 300TK. 258 You Save TK. 42 (14%)
বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঘিরে এর শিক্ষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস, মূলধারার বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য ও অবস্থান, দেশের রাজনীতি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী বৃহৎ পুঁজির ভূমিকা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে চিন্তা
বাংলাদেশের রাজনীতির খেলায় বদলে গেছে খেলোয়াড়দের প্রকৃতি ও অবস্থান, বদলাচ্ছে খেলার কৌশল। এ খেলায় রাজনীতিবিদদের সাথে আছেন বুদ্ধিজীবীগণ ও সংবাদ মাধ্যম এবং সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে যুক্ত হয়েছে পুঁজি, বৃহৎ পুঁজি তথা কর্পোরেট পুঁজির রূপ নিয়ে। এ তিন ক্যাটাগরিকে রাজনীতি, বুদ্ধি ও পুঁজি হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। একথাও সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতি বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে ভিন্নও নয়, বিচ্ছিন্নও নয়, বরং এগোচ্ছে একই তালে ও প্রক্রিয়ায়। এ প্রেক্ষাপটে আবিদুল ইসলাম রচিত “বৃহৎ পুঁজি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি” নামক বইটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমধর্মী নিবন্ধন সংকলন বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
যদিও বইটি “কর্পোরেট পুঁজি”, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি” এবং এ দুইয়ের সম্পর্ক বিষয়ে কোনো সিস্টেমেটিক বিশ্লেষণের বই নয়, তবুও বইটিতে স্থান পাওয়া ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের সময়সীমায় লিখিত মোট ষোলটি নিবন্ধের সংকলনটি পাঠ করলে পাঠকের সামনে উন্মোচিত হবে: বৃহৎ পুঁজির গণ-বিরোধী ভূমিকার ভয়াবহতা ও তার সহযোগীদের পরিচয়; উদঘাটিত হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির শ্রেণি চরিত্রগত বিশ্রী রূপ, এর ক্রমিক অধঃপতন, এবং গণ-মানস সৃষ্টিতে, ইতিহাস চর্চায়, শিক্ষায় ও সংস্কৃতিতে এর কদর্য প্রভাব; এবং প্রকাশিত হবে মূলধারা বলে পরিচিত ধারার বুদ্ধিজীবীদের নৈতিক পতন ও তাদের চিন্তায় বিদ্যমান উগ্রতার রূপ।
বইটি অভিনব; বেশ ভিন্নধর্মী। বইটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা এবং সাম্প্রদায়িকতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত খণ্ডিত ও একপেশে বয়ানের বিপরীতে কেবল যে পূর্ণাঙ্গ আলোকপাতের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান তা নয়, এখানে আমি পেয়েছি গুরুত্বপূর্ণ ও অজানা অনেক তথ্যও। বাংলাদেশে যেসকল প্রতিষ্ঠিত প্রবন্ধকার আছেন, যারা বাঙালী জাতীয়তাবাদ, বাঙালী সংস্কৃতি, বিজ্ঞানমনস্কতা ও অসাম্প্রদায়িকতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তারা যেখানে পশ্চিমের আলোকময়তার যুগে পশ্চিমাদের দ্বারা নির্মিত পক্ষপাতদুষ্ট মতলবি বয়ানকে অতিক্রম করতে পারেননি, সেখানে আবিদুল ইসলামের মধ্যে আধুনিকতাবাদকে ছাড়িয়ে উত্তরাধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্টতই বিদ্যমান দেখতে পাওয়া যায়। এটাকে আখ্যায়িত করা যায় উত্তরাধুনিক সততা, সত্যাগ্রহ ও সাহস হিসেবে।
আবিদুল ইসলামের একটি নিজস্ব ভাষাশৈলী রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে প্রথিতযশা প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গদ্য রচয়িতারাও এজন্য যে তাকে ঈর্ষা করবেন তা দাবী করা চলে। বাক্যে পদের বিন্যাস এবং অনুচ্ছেদে বাক্যের বিন্যাসে এমন একটা সাবলীলতা আছে যা পাঠকে সহজ ও সেইসাথে আনন্দদায়ক করে তোলে। গদ্যে একটা কাব্যিক প্রবাহ না থাকলে রস জোটে না। এ রস সৃষ্টি করতে গেলে বাক্যকে দীর্ঘ করতে হয়, শব্দসম্ভারকে বিস্তৃত করতে হয়; কমা চিহ্নের ব্যবহার বাড়ে, একটি বাক্যে একাধিক ধারণাকে সমন্বিত করতে হয়। কিন্তু এধরণের গদ্য পড়তে এখনকার সাধারণ পাঠকেরা খুব উৎসাহী নন। কিশোর ও যুবাবয়সী পাঠকদের কাছে কাজি আনোয়ার হোসেন বা হুমায়ুন আহমেদের লেখা প্রিয় হয়ে উঠতো না যদি তারা ছোট ছোট সরল বাক্যে গদ্য রচনা না করতেন এবং আটপৌরে শব্দের মধ্যেই গদ্যকে সীমিত না রাখতেন। আবিদুল ইসলামের ভাষার মাধুর্যটা এখানে যে, এতে দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে বটে, কিন্তু পদ, বাক্যাংশ ও তথ্য বিন্যস্ত করা হয়েছে একটা সাবলীলতামণ্ডিত অগ্রসরমানতা বজায় রেখে। বাক্যের সামগ্রিক অর্থ বোঝার জন্য কোনো বাক্যকেই একবারের বেশী পড়তে হবে না পাঠককে। তার গদ্যে ভাষাগত সহজপাঠ্যতা ও সাহিত্যিক রসময়তার একটি অপটিমাম অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যুবাবয়সী পাঠকেরা আবিদুল ইসলামের বই পড়ে জীবন-সচেতনতার পাশাপাশি ভাষা-দক্ষতা অর্জন করতেও সক্ষম হবেন।