মানবেতিহাসের পাতায় পাতায় যুগে যুগে অসংখ্য মহামানবের আবির্ভূত হওয়া এবং তাঁদের পবিত্র করস্পর্শে পৃথিবী আলোকিত হওয়ার কাহিনি লিপিবদ্ধ রয়েছে। সে সকল মহামানবের মধ্যমণি হিসেবে সর্বকালীন মানুষের কাছে বরিত হয়েছেন যিনি, তিনি আখেরী নবি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা (স)। পবিত্র কোরানে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘(হে রাসুল,) আমরা তোমাকে জগতসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স) তাই স্বয়ং মহাবিশে^র রব অর্থাৎ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক ঘোষিত ‘রহমাতাল্লিল আলামীন’। সেই রহমাতাল্লিল আলামীন সম্পর্কে বিশ্বে নানামুখী গ্রন্থ-কেতাব রচিত হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হচ্ছে ‘শানে রহমাতাল্লিল আলামীন’ নামক গ্রন্থটি। আপাত চাকচিক্যের মোহে অন্ধ মানুষজনকে প্রকৃত ঐশ্বরিক চেতনায় জারিত করতে নবি-রাসুলগণ যুগে যুগে অসংখ্য মুজিযা (অত্যাশ্চর্য অলৌকিকতা) দেখিয়েছেন। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর সবচেয়ে বড় মুজিযা পবিত্র কোরান। সেই পবিত্র কোরান হচ্ছে মহানবি (স)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আকর গ্রন্থ। অসংখ্য তাফসীরকার পবিত্র কোরানের নানামুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের সেসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অবধারিতভাবেই মহানবি (স)-এর চরিত্রের নানামুখী বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে। এসব বৈচিত্র্যের মাঝেও ব্যাপক পঠন-পাঠনের অভাবে একমুখিনতা আমাদেরকে সংকীর্ণ চেতনাবোধে প্রভাবিত করে। ভিন্নরুচিকে একীভূত করার প্রত্যয়ে এ গ্রন্থে প্রধানত তিনটি ভাবধারায় মহানবি (স)-এর পবিত্র কোরানিক চরিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তুলনামূলক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমাদের যথার্থ সত্য অনুধাবনে সহায়ক হবে এবং মহানবি (স)-এর প্রকৃত পরিচয় আবিষ্কারে আমরা সক্ষম হবো। আমরা বিশ্বাস করি, নিরন্তর প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও এ গ্রন্থে মহানবি (স)-এর চরিত্রের ব্যাপক বৈচিত্র্য তুলে ধরা সম্ভব হয়নি; তথাপি আমাদের প্রচেষ্টা পাঠককে বৈচিত্র্যের স্বাদ আস্বাদনে সহায়তা করবে। সবাইকে বৈচিত্র্যের জগতে স্বাগতম।
আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো কোনো ব্যক্তির জবানবন্দিও যে কখনও কখনও কালকে জয় করতে পারে, পারে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে; তার সাক্ষাৎ প্রমাণ খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে এথেনীয় আদালতে দেওয়া মহান দার্শনিক সক্রেটিস ও ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে পরাধীন ভারতের আদালতে দেওয়া কাজী নজরুল ইসলামের জবানবন্দি। এ যেন জবানবন্দি নয়, মোহনবাঁশি-যার কানে তার সুর পৌঁছেছে, সে বিমোহিত হয়েছে। আর তথাকথিত রাজশক্তি ও কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তির কানে তপ্ত সীসা ঢালার মতোই মনে হয়েছে। শাসক ও স্বার্থবাদী শক্তি তাই রোষে কাণ্ডজ্ঞানশূন্য হয়ে সেই আগুনকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে। একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও অপরজনকে জেল-জুলুম দিয়েও সম্ভব হয়নি কণ্ঠরোধ করা।
দিনের পর দিন পার হয়েছে-সেদিনের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ঐ দুজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ মানুষের মনে তাঁদের আসন আরও পাকাপোক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের হার না-মানা প্রতিটি উক্তি আজও উদ্দীপ্ত করে মানুষকে। যে আগুন তাঁরা আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জ্বেলেছেন, তা কোনোদিনও নিভে যাওয়ার নয়।
তাই তো তাঁদের জবানবন্দিকে বলা হয়েছে- 'অগ্নিঝরা জবানবন্দি'। পাঠক উক্ত গ্রন্থে সেই আগুনের স্বরূপ কিছুটা হলেও দেখতে পাবেন বলেই আমার বিশ্বাস।