জীবনানন্দ যেন নিজের বাস্তব জীবনের যাবতীয় রিক্ততাকেই তুলে ধরেছেন 'কারুবাসনা উপন্যাসে। হেম এবং তার স্ত্রী কল্যাণীর আদলে যেন নিজের দাম্পত্যজীবনের অন্তর্গত দ্বন্দ্বই উঠে এসেছে। জীবনানন্দের লেখা উপন্যাসগুলোর ধারাক্রম বিবেচনা করলে সেই সময়ে তাঁর নিজ জীবনের নানা ঘটনাপঞ্জির প্রতিফলনই যেন উপন্যাসে দেখতে পাই।
কারুবাসনা উপন্যাসের চৌত্রিশ বছরের হেম বারবার কলকাতায় গিয়ে জীবিকার কোন উপায় বের করতে না পেরে ফিরে আসে নিজ গ্রামে। সে কবিতা লেখায় নিজেকে মগ্ন করে রেখেছে। স্ত্রী কল্যাণীর সাথে তার কথোপকথন বেশিরভাগ সময়েই যেন একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধেরই আভাস দেয়। সাংসারিক নানা প্রয়োজন মেটাতে নূন্যতম যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তাও যখন হেম মেটাতে পারে না, তাকে নির্ভর করতে হয় পরিবারের অন্য সদস্যদের উপর, তখন নিজেকে রিক্ত এবং কখনো শুধু বাতিল বলে গণ্য করতে সে পুনরায় ভাবে না।উত্তম পুরুষে বর্ণিত উপন্যাসে হেম নিজেকে ঠিক এভাবে বিচার করে :
" কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ই শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভিতর কল্পনা ও স্বপ্ন চিন্তার দুশ্ছেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়। "
তাদের আড়াই বছরের মেয়ে খুকি, যে কিনা অতটুকু বয়সেই বাবা-মা'র বিভিন্ন মালিন্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার শিকার, তাকে সামলে রেখেছে ঠাকুরদা- ঠাকুরমা, তার অল্প বয়সের বিহবলতাও ফুটে উঠেছে অত্যন্ত করুণভাবে, যা মন খারাপ করে দেওয়ার মতো।
" খুকি খাটের এক কিনারে পা ঝুলিয়ে পাথরের মত চুপচাপ বসে থাকে ; বয়স আড়াই বছর, দেখায় এক বছরের মতো ; বিচার-কল্পনার শক্তি হয় ত চল্লিশ বছরের গৃহিণীর মতো ; জীবনের আস্বাদ সত্তর বছরের মানুষের মত ; এর ভবিষ্যৎ কী, আমি ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারি না কিছু। "
একদিন হেম তার মেয়েকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসে ঘুম পাড়াবার জন্য। তখন তাদের যে বাক্যালাপ হয়, তাতে যেন সমস্ত মায়া, আকুলতা, সাংসারিক উপায়হীনতা, শিথিলতা, ভালোবাসা সবকিছু একসাথে ধরা পড়ে।