মুসলমানদের দ্বীন ও ঈমানের জন্য হিজরী পঞ্চম শতাব্দী ছিল অগ্নি পরীক্ষার সময়। এসময় মুসলমানগন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ধর্মের শাখা-প্রশাখাসমূহকে ধর্মের মুল বিষয় মনে করে একে অপরকে কাফির বলে আখ্যায়িত করতো। আর এহেন আত্মকলহ দ্বারা ইসলামের ভীষণ ক্ষতি সাধিত হচ্ছিল। অন্যদিকে গ্রীক ফারসাফা (দর্শন) মতবাদের প্রভাব দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে গিয়েছিল। আর ইসলামী ধ্যান-ধারণা নিষ্প্রাণ ও নিস্তেজ হতে লাগল। তখনকার মুসলিম আলেমগণ গ্রীক দর্শনে অনভিজ্ঞ ছিলেন বিধায়,তাদের দার্শনিক ভ্রান্তির প্রতিরোধে অক্ষম ছিলেন। কালক্রমে এমন অবস্থার উদ্ভব হলো যে,তখনকার জ্ঞানী-গুণী,ধনী-দরিদ্র সকল শ্রেণীর মানুষ কুরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন গঠনের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। তখন জন্ম নিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী। তাঁর আসল নাম আবু হামিদ মুহম্মদ। তাহার পিতার ও পিতামহ উভয়ের নামই মুহম্মদ।তিনি খোরাসানের অন্তর্গত তুস নগর এর গাজালা নামক স্হানে জন্ম গ্রহন করেন। তাই সবাই উনাকে গাজ্জালী নামেই চিনে। ইমাম গাজ্জালী রা: এর যুগে পারস্যের সম্রাট ছিলেন সলজুক বংশীয় সুলতান রুকনুদ্দীন তোগরল বেগ। সলজুক বংশীয় সুলতাংনের রাজত্বকাল মুসলমানদের চরম উন্নতির যুগ ছিল। তাহাদের পুর্বে ইরান শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত বুইয়া বংশীয় রাজাদের শাসনাধীন ছিল। এই সময় মুসলিম শক্তি সমুহ পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ,আক্রমন-প্রতিআক্রমনের ফলে দুর্বল হয়ে পরেছিল। কিন্তু সলজুক বংশীয় তুর্কীগন ইসলাম গ্রহন করলে তাদের প্রাক ইসলামী স্বভাব চরিত্র ও মুল্যবোধে বিড়াট পরিবর্তন সাধিত হয় এবং তাদের মাধ্যমে এক অনুপম সভ্যতা গড়ে উঠে।ফলে তারা মুসলিম বিশ্বের লুপ্ত প্রায় শক্তি ও প্রতিভাকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম হয়। এই শক্তির অভ্যুদয়ের ফলে খ্রীষ্টান শক্তির অগ্রগতি রহিত হয় এবং সমগ্র অশিয়ার এক বিরাট অংশ এই সুলতান গনের অধীনে এসে পড়ে। । তৎকালে প্রচলিত ইহুদী ,খৃষ্টান ও পারসিকদের জ্ঞানার্জন সমাপ্ত করে প্রাচীন গ্রীক,মিশরীয় ও ভারতীয় জ্ঞানারহনে তারা প্রবৃত্ত হন। অত্যধিক পরিমানে পার্থিব জড়বাদের প্রভাবে ধর্ম জ্ঞানের শ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় এবং মুসলমান সমাজে ইসলামী বিশ্বাস ও ধর্মকার্যের ক্ষেত্রে এক চরম বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।ইহা হতে সমাজকে মুক্ত ও রক্ষা করার দায়িত্বই ইমাম গাজ্জালী রঃ এর উপর অর্পিত হয়। এই ক্ষনজন্মা মহাপুরুষের অতুলনীয় প্রতিভা যে নিপুনতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন, তাহা সমগ্র বিশ্ব বিস্ময় ও ভক্তিভরে আজীবন স্বরণ করবে।