ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশে কৃষিতে পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রের উদ্ভব ও বিস্তার নিয়ে মার্ঙ, কাউটস্কি ও লেনিনের চিন্তাভাবনায় যেসব তাত্ত্বিক ধারণা ছিলো তার সমন্বয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে কৃষি প্রশ্নের মূল ধারণা বা প্যারাডাইমটি তৈরী হয়। পরবর্তীতে, ইয়োরোপে সামন্ততন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রে উত্তরণের বিতর্কের মাধ্যমে এই প্যারাডাইমটি পরিমার্জিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা ইয়োরোপ থেকে অনেকাংশেই ভিন্ন। সেজন্য এদেশের পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে কৃষি প্রশ্নের প্যারাডাইম পুনঃনির্মাণ) করা দরকার। সেটা অবশ্য অনেক বড় কাজ। তাই আজকের আলোচনায় শুধু কৃষিতে ধনতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে ভূমি সংস্কারের অবদান কিরকম, এবং সেই প্রেক্ষিতে খাস জমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণআন্দোলন কি ধরনের ভূমিকা রাখতে পেরেছে, এ দু’টো বিষয় মূল্যায়নের চেষ্টা করবো। ধনী ও ক্ষমতাবানরাই মূলতঃ জমি দখল করায় জড়িত। এর ফলে তাদের হাতে জমির পুঞ্জিভবন ঘটে। এর অপর দিক হলো যে যারা ক্রমাগত জমি হারায়, তারা নিঃস্বতার দিকে ধাবিত হয়। একদিকে জমির পুঞ্জীভবন, অন্যদিকে নিঃস্বকরণ, এ দুই প্রক্রিয়ার সংযুক্ত ফলাফল হচ্ছে মেরুকরণ । পুনর্বণ্টনকামী ভূমিসংস্কার মেরুকরণ প্রক্রিয়াকে রুখতে বা সামগ্রিকভাবে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে। ঐতিহাসিকভাবে এ ধরনের ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে জমির মালিকানা পুনর্বণ্টিত হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে জাপান ও তাইওয়ানে, যা এই দেশগুলোর কৃষিখাত এবং সামগ্রিক অর্থব্যবস্থার ধনতান্ত্রিক রূপান্তরে বড়রকমের সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। যেহেতু এ ধরনের ভূমি সংস্কার জমির বৃহৎ মালিক এবং সংশ্লিষ্ট মহাজনী ও ফটকাবাজীর স্বার্থকে আঘাত করে, সেহেতু এই প্রভাবশালী শ্রেণীগুলি স্বাভাবিকভাবেই তার বিরোধিতা করে। সেজন্য তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধকে ঠেকানো এবং অতিক্রম করার জন্য ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রের শক্তি এবং আইনী ক্ষমতার ব্যবহার ছিল একান্ত প্রয়োজনীয়।