কুরআন সবচেয়ে ভালো বুঝতেন কে? নিশ্চয়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তারপর সাহাবিগণ। তারপর তাবিয়িগণ। ফলে, সেই সোনালি যুগের যতটা কাছাকাছি যেতে পারব, কুরআনের ততটা বিশুদ্ধ বুঝ আমরা পাব। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই।
তাফসীরুল আইম্মাহ ঠিক এই কাজটিই করবে। আমাদেরকে পৌঁছে দেবে কুরআনের অথেনটিক ব্যাখ্যার দুয়ারে। আমরা জানি, ইসলামের প্রথম পাঁচশ বছরেই কালজয়ী তাফসীর-গ্রন্থগুলো রচিত হয়। সেগুলোর সারনির্যাস প্রতি পৃষ্ঠায় তুলে আনা ছিল বিরাট এক চ্যালেঞ্জ। আর সেই কঠিন কাজটিই আঞ্জাম দিয়েছেন শাইখ জিয়াউর রহমান মুন্সী। এই একখানি তাফসীর পড়েই আমরা হিজরির শুরুর-দিকে-রচিত প্রামাণ্য তাফসীরগুলোর সারনির্যাস পেয়ে যাব। সংকলক মহোদয় এখানে নিজের কোনো ব্যাখ্যা বা মতামত যুক্ত করেননি। বরং প্রাধান্য দিয়েছেন সালাফে সালিহীনের বক্তব্যকেই।
আলহামদুলিল্লাহ; মহান ইমামগণ যেভাবে কুরআন বুঝেছেন, সেই বোঝাপড়াই এখন এক মলাটে শোভা পাচ্ছে—আপনার হাতে!
সাবলীল অনুবাদ ও পার্শ্বটীকা : অর্থের বিশুদ্ধতা যেমন ধরে রাখা হয়েছে, তেমনি ভাষাটাও প্রাণবন্ত। এককথায় হৃদয়ছোঁয়া অনুবাদ। প্রতিটি পৃষ্ঠার অনুবাদ সাজানো হয়েছে এক অভিনব স্টাইলে—প্যারা আকারে। যখনই নতুন টপিক আসবে, ঠিক সেখানেই শুরু হবে নতুন প্যারা। এ ছাড়াও প্রতিটি প্যারার পাশেই টীকা-আকারে যুক্ত করা হয়েছে সূরার মেজর থিম, শিক্ষা ও ক্রস-রেফারেন্স।
প্রাচীন ও প্রামাণ্য তাফসীর : কুরআনের যে-সকল আয়াত বোঝার জন্য ব্যাখ্যা দরকার, সেগুলোর ব্যাখ্যা পেয়ে যাবেন এই অংশে। প্রায় দেড় লক্ষ শব্দে এখানে তুলে আনা হয়েছে প্রাচীন তাফসীরগুলোর সারনির্যাস। প্রতি পৃষ্ঠার তাফসীর শেষ করা হয়েছে প্রতি পৃষ্ঠাতেই—যেটা খুবই ইউনিক একটা ফিচার! ফলে, অনুবাদের সাথে সাথে তাফসীরটাও খুব সহজেই পড়ে ফেলা যাবে।
এ তাফসীরের ক্ষেত্রে যেসব মূলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে :
(১) তাফসীরুল কুরআন বিল-কুরআন : কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা যদি কুরআনের অন্য কোনো আয়াতে পাওয়া যায়, তবে সেটাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
(২) তাফসীর বিস-সুন্নাহ : কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা হাদীসে পাওয়া গেলে, সেটাই উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩) তাফসীরুস সাহাবাহ : কোনো আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবি ও তাবিয়িগণের কোনো আছার বা মন্তব্য পাওয়া গেলে, তা যুক্ত করা হয়েছে।
(৪) তাফসীরুল আইম্মাহ : কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা যদি প্রথম তিনটি উৎসে পাওয়া না-যায়, তখন ইমামগণের বক্তব্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে ইমাম তাবারি, ঝাজ্জাজ, বাগাবি, যামাখশারি, ইবনু আতিয়্যা আন্দালুসি ও বায়যাবি—এরকম মহান মনীষীদের তাফসীর-গ্রন্থগুলোকে প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সূরার নামকরণ ও অর্থ : প্রতিটি সূরার নামের রহস্য উল্লেখ করার কারণে পাঠক শুরুতেই একটি বেসিক ধারণা পেয়ে যাবেন।
শানে নুযুল : কুরআন নাযিল হয়েছে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বা ঘটনাকে সামনে রেখে। সেসব প্রেক্ষাপট জানা থাকলে কুরআন বোঝা অনেকটা সহজ হয়। বিশুদ্ধ হাদীস ও প্রামাণ্য তাফসীরগ্রন্থ ঘেঁটে যতগুলো শানে নুযুল পাওয়া যায়, তার প্রায় সবগুলোই এ-তাফসীরে উঠে এসেছে।
ফজিলত : কুরআন মাজীদের সবগুলো সূরাই ফজিলতপূর্ণ। তবে বিশেষ কিছু সূরা ও আয়াতের রয়েছে বাড়তি ফজিলত। হাদীসের গ্রন্থগুলো থেকে এরকম প্রায় ৬০টি ফজিলত এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাষাশৈলী : মানুষের জন্য কুরআনকে আল্লাহ সহজ করেছেন। তবে চিন্তাশীল পাঠকের জন্য কুরআন এক মহা-বিস্ময়ও বটে। কুরআনের ভাষা অতি উঁচুমানের—অলংকারপূর্ণ। নাহু-সরফ, বালাগাত, লুগাত—এরকম অনেকগুলো শাস্ত্রের আকরগ্রন্থ কুরআন মাজীদ। এই তাফসীরে প্রায় ৬০০ জায়গায় ‘ভাষাশৈলী’ শিরোনামে শব্দের গভীর তাৎপর্য ও উপমা-রূপকতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে—যা পাঠককে দেবে ভিন্ন এক স্বাদ।
বিকল্প অনুবাদ : কুরআনের কিছু শব্দের রয়েছে একাধিক অর্থ। আবার, ব্যাকরণগত বিন্যাসের কারণেও কখনো একটি আয়াতের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ করার সুযোগ থাকে। এমন প্রায় ৩০০টির বেশি জায়গায় ‘বিকল্প অনুবাদ’ যুক্ত করা হয়েছে। যাতে পাঠক সম্ভাব্য কোনো অর্থ থেকেই বঞ্চিত না হন।
অনুবাদ ও তাফসীর সংযোজক পরিচিতি:
শাইখ জিয়াউর রহমান মুন্সী (হাফিজাহুল্লাহ)। জন্ম ১৯৮৪ সালে, কুমিল্লায়।
পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন। তারপর হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করে নানুপুর মাদরাসা থেকে কওমি নেসাবের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পড়াশোনা করেন তামিরুল মিল্লাত মাদরাসায়। আলিম পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা-তালিকায় ২য় স্থান, ফাজিল পরীক্ষায় ১৪তম স্থান অর্জন-সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি।
পেশাগত জীবনে অধ্যাপনা করেছেন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি আরবি, ইংরেজি, উর্দু ও ফারসি ভাষাতেও তিনি পারদর্শী। এ ছাড়া ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ল্যাটিন প্রভৃতি ভাষার চর্চাও অব্যাহত রেখেছেন। যথার্থতা ও সাবলীলতা বজায় রেখে অনুবাদ-কর্ম সম্পাদনে তার মুনশিয়ানা চোখে পড়ার মতো। নির্দ্বিধায় বলা যায়, যথার্থ-অনুবাদ ও নতুন আঙ্গিকে ইলমি-গ্রন্থ নির্মাণে সময়ের অন্যতম অগ্রণী ব্যক্তিত্ব শাইখ জিয়াউর রহমান মুন্সী। তার অনূদিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাসূলের চোখে দুনিয়া, সীরাতুন নবি (সা:), শামাইলুন নবি (সা:) , জীবিকার খোঁজে, মৃত্যু থেকে কিয়ামাত, আপনার প্রয়োজন আল্লাহকে বলুন, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল, বান্দার ডাকে আল্লাহর সাড়া, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর মর্মকথা, চল্লিশ হাদীস, সুন্দর আখলাক এবং কুরআন মাজীদ-এর একটি স্ট্যান্ডার্ড অনুবাদ।
এ ছাড়া ক্ল্যাসিকাল ইমামদের ব্যাখ্যা সংযুক্ত করে শাইখ একখণ্ডে প্রণয়ন করেছেন তাফসীরুল আইম্মাহ। পাশাপাশি তিনি সংকলন করেছেন সবার ওপরে ঈমান—যেখানে ৯০টি হাদীসগ্রন্থের ঈমান-সংক্রান্ত প্রায় সকল হাদীস ঠাঁই পেয়েছে!