অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে উদ্ভিদবিজ্ঞানে বিএসসি (সম্মান), এমএসসি (থিসিস) এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরেই তিনি প্রথম বিভাগ/প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, শিকাগো থেকে ক্রান্তীয় জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০০৩ সালের ৩০ জুন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ২০১৩ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ পর্যন্ত তিনি ৬৩ জন এমএস গবেষণা শিক্ষার্থী, একজন পিএইচডি গবেষক এবং একজন এমফিল গবেষককে সফলভাবে তত্ত্বাবধান করেছেন। বর্তমানে তাঁর তত্ত্বাবধানে একজন পিএইচডি, দুইজন এমফিল এবং দুইজন এমএস গবেষণা শিক্ষার্থী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি উদ্ভিদ শ্রেণিবিন্যাস, নৃ-উদ্ভিদবিজ্ঞান এবং ক্রান্তীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান করেন। গবেষণাক্ষেত্রে ড. জসীমের অবদান অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এ পর্যন্ত তিনি দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ও প্রকাশনায় ১০৭টি গবেষণাপত্র, বই এবং বইয়ের অধ্যায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশনা Plant Taxonomy, Botany, Asiatic Society (Sciences), PLOSE One, Springer, Elsevier এবং American Primate-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের জার্নাল ও প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশের জন্য ২০টিরও বেশি নতুন উদ্ভিদ প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ম্যাগাজিন, স্মরণিকা ও সংবাদপত্রে তিনি বহু বাংলা প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ড. জসীম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজক, বক্তা এবং অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ১০০টিরও বেশি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কর্মশালা ও সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং এ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, মালয়েশিয়া, ভারতসহ বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থার ৫০টিরও বেশি গবেষণা প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন এবং দেশে-বিদেশে বহু গবেষণা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি Bangladesh Journal of Botany এবং Journal of Biological Sciences-এর সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য এবং Frontiers in Sustainable Urban Forestry-এর অতিথি সম্পাদক হিসেবে যুক্ত আছেন। ResearchGate-এ তাঁর গবেষণাকর্ম ৭২,০০০ বারেরও বেশি পঠিত হয়েছে। Google Scholar-এ তাঁর H-index ২৪, i10-index ৪০ এবং উদ্ধৃতি সংখ্যা ১,৯৫৫। ২০২২ সাল থেকে তিনি বিশ্ব ও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে স্থান করে নিয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও ড. জসীম সুপরিচিত। তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনমিস্টস-এর সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বোটানিক্যাল সোসাইটির নির্বাচিত কোষাধ্যক্ষ এবং বাংলাদেশ বোটানি অলিম্পিয়াডের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ বোটানিক্যাল সোসাইটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ বোটানিক্যাল সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবোরিকালচারের পরিচালক এবং অমর একুশে হলের প্রভোস্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তিনি চ্যানেল আইয়ের নেচার অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। সম্প্রতি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ২০২৫-এর প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সমিতির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করছেন। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাঁর নিবেদন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রকৃতি বিষয়ক গবেষণা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে “বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ইকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (BSERI)” নামে একটি অলাভজনক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন । গবেষণার বাইরেও ড. জসীম দেশ-বিদেশের বহু বৈজ্ঞানিক সংস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি প্রায় প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশীয় উদ্ভিদের ছবি ও তথ্য প্রকাশ করে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি Facebook-ভিত্তিক “Biodiversity Conservation Initiatives Bangladesh”, “Flora of Bangladesh” এবং “Taxonomy Matters”-এর প্রশাসক। প্রতি বছর বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে তিনি সেমিনার ও বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করেন এবং Nature Watch Program-এর অংশ হিসেবে সুযোগ পেলেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে যান। ড. জসীমের গবেষণার আগ্রহ বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—বনের উদ্ভিদ তালিকা প্রণয়ন, নতুন উদ্ভিদ শনাক্তকরণ, নৃ-উদ্ভিদবৈজ্ঞানিক গবেষণায় উদ্ভিদ ও মানুষের সম্পর্ক, বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান, বায়ুদূষণের প্রভাব, জীববৈচিত্র্যের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, ঔষধি উদ্ভিদের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিডায়াবেটিক কার্যকারিতা, আক্রমণাত্মক উদ্ভিদের প্রভাব ও ব্যবস্থাপনা, জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং দেশীয় বৃক্ষরোপণ আন্দোলন। শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক ও প্রকৃতিপ্রেমী—এই চারটি পরিচয়ের অনন্য সমন্বয়ে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আন্দোলন এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।