মেঘনা। মেঘ নয়। তবে মেঘের কান্নায় ফুঁসে ওঠে। চাঁদপুরের মোহনায় ফোটে ভয়াল রূপ। ভারতের লুসাই পাহাড় পেরিয়ে আসা জলে যৌবনাবতী হয় আরও।
প্রতি বর্ষায় সে যৌবনে ভেসে যায় মেঘনার জনপদ। ভেঙে পড়ে চুরচুর করে। লাখো মানুষের পরাজয় কাব্যে তাই জড়িয়ে মেঘনা। বালুচরের সে জীবনের গল্পই ৩২ জাইল্যারআঁটখোলা।
১৯৯৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় মুছে যাওয়া ৩২ জাইল্যারআঁটখোলার মলাটবদ্ধ ছবি এ উপন্যাস। মেঘনার গ্রাসে বেঁচে যাওয়া, ভেসে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের গল্পই মূল উপাদান।
দীর্ঘ পঁচাত্তর বছরের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির বয়ানে ৩২ জাইল্যারআঁটখোলা মূলত সামাজিক উপন্যাস। রয়েছে বাহান্নর মাতৃভাষার অধিকার। সত্তরের বন্যায় ভেসে যাওয়া আখ্যান। রয়েছে আমাদের মহান জন্মলগ্ন।
মুক্ত ভূমি পাওয়ার লড়াই। রয়েছে নিজের একটা পরিচয়ের যুদ্ধ। নব্বইয়ের অভ্যুত্থান পেরিয়ে আটানব্বই এর কন্যা। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জীবনের সাক্ষী ৩২ জাইল্যারআঁটখোলা।
দীর্ঘ কলেবরের এ উপন্যাসের কেন্দ্র মূলত সম্পর্ক। যার মূল ভিত্তি পরিবার। বিপৎসংকুল পথ পেরিয়ে যে পরিবার খুঁজে পেতে চায় স্থিরতা। প্রজন্মান্তরে বয়ে চলা দায়িত্ববোধই ৩২ জাহাল্যারআঁটখোলার মূল।
অতীতের সাথে বর্তমানের টানাপোড়েনের খেরোখাতায় জমা এ উপন্যাসের শুরুটা আলাদা। মাত্র দেড় পৃষ্ঠা লিখবো বলে শুরু করা গল্প থেমেছে আটশোর কাছাকাছি গিয়ে।
টানা দুমাস লিখেছি আমি। শব্দের হিসেবে ছাড়িয়েছে দু লাখ। পঁচিশের আগস্টের শেষে শুরু হওয়া লেখা থেমেছে অক্টোবরের শুরুতে। পুরোটা লিখেছি মোবাইলেই। গুগল ডক্সে।
আনন্দ লাগছে ভূমিকা লিখতে। যিনি পড়ে দেখছেন ভূমিকা এ মুহূর্তে, অনেক ধন্যবাদ। এটা আপনারই গল্প। বাবা, মা, ভাই আর বোনের জীবন আর তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার গল্প।
যার পরতে পরতে রয়েছে হারিয়ে ফেলা, অতীত হয়ে যাওয়া জীবনের চিত্রণ। লিখতে গিয়ে যেন জড়িয়েছি ঘোরে। উপন্যাসের চরিত্রগুলোই যেন হাঁটতে, বলতে, হাসতে বা কাঁদতে থাকে মাথায়।
বড্ডা দাদু, ছোট্ট দাদু, বড্ডা নানু, ছোট্ট নানু, আব্বা, আম্মা, বড্ডা আপা, মেঝ আপা, লুনা আপা, ভাইয়া কিংবা মনি। এ চরিত্রগুলো এখন আপনার হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। তবে, একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।
৩২ জাইল্যারআঁটখোলা কেমন উপন্যাস? এ প্রশ্নের উত্তর আপনারাই দিতে পারবেন পাঠক। কারও চোখে এটি হতে পারে ইতিহাস। কেউ বা ভাবতে পারেন সামাজিক দলিল। আবার কারও কাছে সম্পর্কের নানামুখী বোঝাপড়ার গল্প। এর চূড়ান্ত সমীকরণ আপনাদের হাতেই। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানামুখী সময়ের আশ্রয়ে বয়ে চলা এ উপন্যাস এগিয়েছে কল্পনার মিশেলে।
চারপাশের দেখা বাস্তবতা, চেনা চরিত্রের অচেনা গল্পের ঠিকানা ৩২ জাইল্যারআঁটখোলা। আমি যদি বলি, তবে এটি মূলত ঠিকানার গল্প।
মেঘনার উদরে বিলীন হয়ে যাওয়া মরচে পড়া দোচালা ঘরের একটি বাড়ির গল্প এটি। সুপারিবাগান ঘেরা, খেজুর গাছের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, ছায়া সুনীবিড় এক বাড়ির গল্প এটি।
মধ্যরাতে মেঘনার ভোজ হওয়া সে বাড়ি সাতাশ বছর পর এসেই যেন ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে উপন্যাসের পরতে পরতে। মুছে যাওয়া প্রতিটি ভোর, বরষা কিংবা জোনাক জ্বলা চাঁদনী রাতের গল্প এটি।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের গল্পই ৩২ জাইল্যারআঁটখোলা। প্রথম খণ্ড এখন আপনার হাতে। পরের খণ্ডে আরও বিস্তৃত হবে সময়।
প্রিয় পাঠক, এটি আমার প্রথম উপন্যাস। অনেক ধন্যবাদ আমাকে পড়ার জন্য। যদি জানতে চান, কেন লিখলাম। তবে তার উত্তর দিয়েই শেষ করি।
পেশাগত জীবনে ফুগ পার করেছি মানুষের জীবন জানাতে জানাতে। লাখো লাখো মানুষের গল্পই যেন আওড়ে গেছি রোজ। কখনো সাংবাদিক, কখনো সংবাদ উপস্থাপক হয়ে।
অচেনা সব মানুষের জীবন জানাতে গিয়ে যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। পুরো উপন্যাস জুড়েই তাই, চলেছে আত্মঅনুসন্ধান। এতোটা বছর পর এসে ইচ্ছে হলো নিজের গল্প বলতে। সে গল্পই এখন আপনার হাতে।
৩২ জাইল্যারআঁটখোলা, নীড়হারা প্রতিটি জীবনের গল্প। যারা ভাঙনে হারিয়েছেন সব। ঘর, বাড়ি, শৈশব, তারুণ্য কিংবা বার্ধক্য। কবর। এমনকি স্মৃতিও। অমূল্য সে জীবনের ছবিই ফুটেছে পুরো উপন্যাসে।
অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আপনাদের। ভালোবাসায় রাখবেন।