হাজারো বছর ধরে কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলা। পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার অংশ হিসেবে উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল, গ্রিক, রোমান, ইজিপশিয়ান কিংবা চায়নিজ সভ্যতার চেয়ে বাংলা কোনো ভাবেই পিছিয়ে ছিল না। শুধু প্রাচীন কাল নয়, বর্তমান সময়ের সুপার পওয়ার আমেরিকার অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছে বাংলায় বাণিজ্যের মাধ্যমে, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পেছনে রয়েছে বাংলার অর্থ, বাংলা থেকে চায়নিজরা জ্ঞান যেমন অকাতরে গ্রহণ করেছেন তেমনি বাংলার ওপর বাণিজ্যেও তারা নির্ভরশীল ছিলেন। পুরো ইওরোপ বাংলায় উৎপাদিত বস্ত্রের জন্য অপেক্ষা করতো। আরব ও আফ্রিকায় বাংলার পণ্য ছিল খুবই আদৃত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বাংলার বাণিজ্যের পাশাপাশি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দিয়েও প্রভাবিত হয়েছে। একটি একক অঞ্চল হিসেবে উপমহাদেশের ধারণা সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
বাংলা সারা পৃথিবীতে প্রভাব রেখেছে উপনিবেশ স্থাপন করে নয়, যুদ্ধ করে নয়, রাহাজানি বা লুটপাট করে নয়। বাংলা তার অসাম্প্রদায়িক, উদার মানবিকতা, মেধা, দক্ষতা, শিক্ষা, শিল্প ও বাণিজ্য এবং সৃষ্টিশীলতা দিয়েই তা করেছে। যা বাংলাকে অনন্য এক চরিত্রে পরিণত করেছে। অর্থনৈতিক বিষয়েই শুধু নয়, বাংলা সব সময়ই পরিচিতি পেয়েছে আতিথেয়তা, বদন্যতা এবং ভালো মানুষের দেশ হিসেবেও।
‘স্বর্গভূমি বাংলা’ বইটিতে লেখক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান তার প্রায় দুই দশকের গবেষণা ও অনুসন্ধানে বাংলার ইতিহাসের গৌরবময় ও ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি প্রচলিত ধারার ইতিহাস বইয়ের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন এক বাংলাকে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন। ইতিহাসের নতুন এই অভিযাত্রায় আপনাকে স্বাগতম।
পিপলস হিস্ট্রি বা গণমানুষের ইতিহাসকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন সাংবাদিক ও গবেষক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান। তিনি প্রতিনিয়ত শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সী মানুষের কাছে বাংলাদেশের হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে তুলে ধরছেন আকর্ষণীয় প্রেজেন্টেশন ও সহজ ভাষায়। লেখক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ইতিহাসভিত্তিক সংগঠন ‘রুটস হিস্ট্রি অ্যান্ড ফোকলোর রিসার্চ সোসাইটি’-র প্রধান উদ্যোক্তা তিনি এবং দীর্ঘ সময় ইতিহাস গবেষণা ও তথ্যমূলক জার্নাল ‘রুটস’-এর সম্পাদনা করেন। বাংলাদেশের জাতীয় এনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে পরিচিত ‘বাংলাপিডিয়া’-র তিনি অন্যতম কন্ট্রিবিউটর। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ইতিহাস বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘সুবর্ণ অতীত’-এর গ্রন্থণা ও সমন্বয় করেন তিনি। একজন গ্রাফিতি গবেষক হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। বৃটেনের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস গবেষণা সংগঠন ‘রয়াল হিস্টোরিকাল সোসাইটি’ (আরএইচএস) তার দেড়শো বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২১ সালে বিশ্বের যে ১৮জনকে অ্যাসোসিয়েট ফেলো হিসেবে মনোনীত করে- মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান তাদের অন্যতম। আরএইচএস তাকে ‘ওয়ান অফ দি ফার্স্ট’ বা অগ্রগামী অ্যাসোসিয়েট ফেলো হিসেবে বর্ণনা করে। পাশাপাশি তিনি বিশ্বে ইতিহাসপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন হিসেবে পরিচিত ‘আমেরিকান হিস্টোরিকাল অ্যাসোসিয়েশন’ এবং বর্তমান সময়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ধারা ‘বিগ হিস্ট্রি’ বিষয়ক সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল বিগ হিস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্য। তার ইতিহাস গবেষণামূলক কাজকে উৎসাহিত করে আমেরিকাভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংগঠন ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি’। তিনি ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণাকারী সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি’, ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ’, ‘বাংলাদেশ আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি-বারমস’ এবং ‘ইতিহাস একাডেমি, ঢাকা’-র আজীবন সদস্য। পেশাগত জীবনে তিনি একজন সাংবাদিক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে সাংবাদিকতায় জড়িত। বর্তমানে ‘বিপরীত স্রোত’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের একজন স্থায়ী সদস্য। স্কুলে পড়ার সময় থেকে তার লেখালেখি শুরু। কলেজ জীবন থেকে তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত; যা তার সৃজনশীল লেখার ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছে। পেশাগত কাজের বাইরে তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মানব-কল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।