ড. আহমদ তুতুঞ্জির জীবনী তাঁর শক্তিশালী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামী কাজের প্রতি গভীর অঙ্গীকারের এক অনন্য দলিল। তাঁর জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে জনহিতকর উদ্যোগ, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, প্রশাসনিক সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতা, এবং ভ্রমণশীল দাওয়াহমূলক কর্মকাণ্ড; সবকিছুই ছিল ইসলামী আদর্শের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। সতের বছর বয়সে উত্তর ইরাকের ইরবিল শহর থেকে যুক্তরাজ্যে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজের বহুমাত্রিক সংকট ও চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে সচেতন ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন- সচেতনতা, সংশোধন ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ তার ভ্রান্তি কাটিয়ে উঠতে পারে, পতনের পর পুনরুত্থানের পথে এগিয়ে যেতে পারে এবং বিশ্বমঞ্চে পুনরায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হতে পারে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁর ব্যাপক ভ্রমণ তাঁকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন দেশ পরিদর্শন, মাঠপর্যায়ে কাজ এবং নানান প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ব্যক্তির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে তিনি বাস্তব সমস্যাগুলোকে খুব কাছ থেকে অনুধাবন করতে সক্ষম হন। ফলে তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহ মুসলিম যুবসমাজের জন্য এক ধারাবাহিক ও সমৃদ্ধ বাস্তব শিক্ষার উৎসে পরিণত হয়েছে।
ড. তুতুঞ্জির জীবনের এই ধারাবাহিক বর্ণনা বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতির এক জীবন্ত দলিল; যা পাঠককে আধুনিক বিশ্বের প্রখ্যাত মুসলিম ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। মানবতা, উম্মাহ ও ইসলামের খেদমতে আত্মনিয়োগে আগ্রহীদের সম্পৃক্ততা গড়ে তোলতে এটি গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশক। ভবিষ্যতের মূল্যবান সম্পদ যুবসমাজ এই অভিজ্ঞতাসমূহ থেকে অনুপ্রেরণা ও বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। তিনি অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের জীবনের অভিজ্ঞতাকে প্রাণবন্ত, উষ্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত ভাষায় এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, পাঠকের মনে হবে যেন সরাসরি তাঁরই সঙ্গে কথা বলছেন।
ড. আহমদ তুতুঞ্জি একজন চিন্তাবিদ এবং বিশ্বব্যাপী জনকল্যাণধর্মী কাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব। ১৯৪১ সালে উত্তর ইরাকের আরবীল শহরে তাঁর জন্ম । বাগদাদে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। অতঃপর ইরাকের তেল মন্ত্রনালয় হতে মেধাবৃত্তি লাভ করে পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ড গমন করেন। ১৯৬৩ সালে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে অয়েল এণ্ড মিনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। অতঃপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি আমেরিকা গমন করেন। এখানে এসে তিনি পেনসালভেনিয়া রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় হতে তেল উত্তোলন প্রকৌশল বিষয়ে অধ্যয়ন করে ১৯৬৪ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি পিএইডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। ড. তুতুঞ্জি অনেকগুলো একাডেমিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক জনকল্যাণমূলক সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেন। বিশেষত: উত্তর আমেরিকা, কানাডা এবং আরব বিশ্বে। এর উল্লেখযোগ্য হলো- যুক্তরাজ্য ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে মুসলিম ছাত্র সংস্থা Muslim Students Socity (MSS), ইউরোপে সম্মিলিত মুসলিম ছাত্র সংঘ Union of Muslim Students Organization (UMSO), ইসলামি ছাত্র সমাজ ফেডারেশন Federation of Student Islamic Societies (FOSIS) যুক্তরাজ্য ও উত্তর আয়ারল্যান্ড, মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা Muslim Student Association (MSA)। এছাড়াও তিনি অনেকগুলো জনকল্যাণধর্মী সংস্থা ও ওয়াকফ সংস্থা প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেন। যথা- উত্তর আমেরিকায় ইসলামি ওয়াকফ ভার্জিনিয়া রাজ্যের স্যার জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন, কুয়েত আন্তর্জাতিক ইসলামিক জনকল্যাণ সংস্থা ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি সউদী আরবের রিয়াদস্থ ওয়ার্ল্ড এসেম্বলী অব মুসলিম ইয়থ World Assembly of Muslim Youth (WAMY) প্রতিষ্ঠায়ও অংশগ্রহণ করেন । বেশ কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ও একাডেমিক সংস্থা প্রতিষ্ঠায় তিনি অনবদ্য অবদান রাখেন। উদাহরণ হিসেবে International Institute of Islamic Thought (IIIT)- এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে, যা কয়েকজন স্কলারের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন। আর তিনি লিবিয়ায় আল ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয়ে অয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়) অয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিভাগে তিনি দীর্ঘ দশ বছর বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।