পৃথিবীতে এমন অনেক রোগ রয়েছে যেগুলোর নাম আমাদের কাছে অপরিচিত। এগুলোর অধিকাংশই বিরল রোগ। এটি অনাথ রোগ বা অরফান ডিজিজ নামেও পরিচিত। বিরল রোগ বলতে এমন রোগকে বুঝায় যে রোগের রোগী সচরাচর দেখা যায় না। একটি রোগ তখনই ‘বিরল’ বলে বিবেচিত হয় যখন এটি জনসংখ্যার খুব একটি ছোট অংশকে প্রভাবিত করে। দেশভেদে এর সংজ্ঞা ভিন্ন। তবে সাধারণত, একটি রোগ ‘বিরল রোগ’ বলে বিবেচিত হয় যদি গড়ে দশ হাজার মানুষের মধ্যে একজন ওই রোগে আক্রান্ত হয়। সাধারণত উন্নত দেশগুলো ছাড়া এসব রোগের চিকিৎসা অনেক দেশেই থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগকে কেস স্টাডি হিসেবে নিয়ে চিকিৎসা সেবা নির্ণয় করা হয়।
কল্পনা করুন তাদের অবস্থা, যারা এমন কোনো রোগের সাথে জীবনযাপন করছে। এসব রোগ এতটাই অস্বাভাবিক যে রোগটি সম্পর্কে জানা, তথ্য খুঁজে বের করা, অন্যদের সাথে যোগাযোগ করা এবং উপযুক্ত যত্ন নেওয়া একটি কঠিন লড়াইয়ের মতো। বিশ্বব্যাপী ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য বাস্তবতা এটাই। স্বীকৃত গবেষণাগুলো বলছে, বিশ্বে অন্তত সাত হাজারের বেশি বিরল রোগ রয়েছে। যেগুলোর অধিকাংশই জেনেটিক কারণে হয়। এসব রোগের প্রতিটির প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন, চ্যালেঞ্জ ভিন্ন ভিন্ন। ভোগান্তির মাত্রাও ভিন্ন ভিন্ন।
এই তো কয়েকবছর আগে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার আবুল বাজানদার ‘ট্রিম্যান সিনড্রোম’ রোগে আক্রান হন। এ নিয়ে দেশে হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। তাকে দেখলে মনে হতো যেন শরীর থেকে অজস্র গাছের শিকড় নেমে আসছে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেন বাজানদার। অনেক বিরল রোগ এমনই অদ্ভুদ ধরনের হয়। কিছু বিরল রোগী সাধারণ মানুষের মতো জীবন-যাপন করে, কিন্তু জীবনঘাতি রোগ বয়ে বেড়ায়। আবার, কিছু বিরল রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েন, যারা আমৃত্যু ভুগেন। এসএমএ রোগটিও তেমনি একটি বিরল রোগ। গত দুই বছরে আমরা যোগাযোগে থাকা ১১টি শিশুকে হারিয়েছি। কিন্তু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বা এই রোগের লক্ষণ নিয়ে কত শিশু যে মারা গেছে তার হিসাব নেই।
আক্রান্ত রোগীদের অভিভাবকরা একত্রিত হয়ে কিউর এসএমএ বাংলাদেশ সংগঠনটি তৈরি করার পর থেকেই বলা যায় আমাদের দেশে এসএমএ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি বা চিকিৎসায় একটি গতি আসে। অথচ প্রথমদিকে অর্থ্যাৎ কয়েক বছর আগেও রোগটির চিকিৎসা নিয়ে আক্রান্ত শিশু ও অভিভাবকরা পুরোপুরি অসহায় ছিল। এখন নিউরোসায়েন্স, শিশু হাসপাতাল, বারাকাহ জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে গুরুত্বের সাথে এসএমএ’র চিকিৎসাসেবা প্রদাণ করা হয়। এছাড়া দেশে এই রোগের ওষুধের একমাত্র বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান রোশ বাংলাদেশও এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
ধীরে ধীরে বাংলাদেশে এসএমএ’র চিকিৎসা ও রোগ সম্পর্কে সচেতনতা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বেশকয়েকজন চিকিৎসক এগিয়ে এসেছেন এসএমএ’র চিকিৎসায়। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ (সদ্য সাবেক পরিচালক), প্রফেসর ড. কাজী গিয়াস উদ্দিন (বর্তমান পরিচালক), অধ্যাপক ডা. মো. বদরুল আলম, অধ্যাপক ডা. নারায়ন সাহা, ডা. জোবাইদা পারভীন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাওলী সরকার, শিশু বিশেষজ্ঞ ও পালমোনলজিস্ট প্রফেসর ডা. এ আর এম লুৎফুল কবীর, প্রফেসর ডা. সারওয়ার ইবনে সালাম রোমেল, আদ-দ্বীন হাসপাতালের ডা. দীপা সাহা প্রমুখ এগিয়ে আসায় এসএমএ’র চিকিৎসাসেবা খুব দ্রুতই আমাদের দেশে উন্নত ও সহজতর হয়েছে।
এখন এসএমএ নিয়ে মোটামুটি পর্যায়ের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত এসএমএ ক্লিনিক হচ্ছে। টেষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে, হয়তো এই বছরেই বাংলাদেশে এসএমএর জেনেটিক টেষ্ট করা সম্ভব হবে। ওষুধ প্রাপ্তির বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের মাধ্যমে প্রকল্প আকারে একটি বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে রোগটি সম্পর্কে আরো সচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ এসএমএসহ বেশকিছু জেনেটিক রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিয়ের আগে জেনেটিক টেস্ট বাধ্যতামূলক করা জরুরী। বিশ্বের অনেক দেশেই জেনেটিক টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশে এসএমএ রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং যতবেশি সম্ভব মানুষকে টেস্টের আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে দেশে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা জানা যাবে এবং পরিকল্পনা হাতে নেয়া সহজ হবে। পাশাপাশি দেশে এসএমএ রোগের প্রকৃত চিত্র জানার জন্য জাতীয়ভাবে জরিপের ব্যবস্থা করা জরুরী।
এর বাইরেও কিছু বিষয় জরুরী রোগটি প্রতিরোধে। যেমন- দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে এসএমএ ডেডিকেটেড কর্ণার বা এসএমএ কর্ণার স্থাপন করা। এসএমএ রোগের জন্য অনুমোদিত ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয় তালিকাভুক্ত’ করা। এসএমএ রোগ সর্ম্পকে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য কর্মসূচী গ্রহণ করা। সর্বোপরি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সরকারিভাবে এসএমএ রোগীদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করা।
তবে রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে এবং রোগীদের সুবিধার্থে এই গ্রন্থটি লেখা হয়েছে। চিকিৎসকদের সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং রোগীদের সহায়ক পরামর্শমূলক গ্রন্থ আকারেই এটি রচিত। এতে ব্যবহৃত বিভিন্ন মেডিকেল টার্ম কোনো না কোনো গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত বা কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ বা কলাম থেকে নেয়া। সবচেয়ে অবদান রয়েছে কিউর এসএমএ বাংলাদেশ সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের।
গ্রন্থটি পেসেন্ট এডভোকেসির অংশ হিসেবে লেখা। যেহেতু আমি (গ্রন্থের লেখক) চিকিৎসক নই, তাই গ্রন্থটি রচনায় তথ্যগত সহায়তার জন্য বিভিন্ন দেশের জার্নাল, গবেষণাপত্র, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যের উপর নির্ভর করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আমাদের দেশের কয়েকজন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে গ্রন্থের বিভিন্ন তথ্য সন্নিহিত করা হয়েছে। পেসেন্ট এডভোকেট হিসেবে আমার সুযোগ হয়েছিল এসএমএর উপর বেলজিয়ামে অনুষ্ঠিত চারদিনের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এবং ভারতের দিল্লীতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেয়ার। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, জার্মানী, পোল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের আলোচনায় ভার্চুয়ালি অংশ নেয়ার। এসব ফোরাম থেকে প্রাপ্ত বেশকিছু তথ্য এই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রন্থটি রচনার পর তথ্যগত যাচাই এবং নির্ভুলতার জন্য ৩জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে যাচাই করে নেয়া হয়েছে। এই তিন প্রতিথযশা চিকিৎসক হলেন, দেশের প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ও পালমোনলজিস্ট প্রফেসর ডা. এ আর এম লুৎফুল কবীর, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক আবদুন নূর তুষার এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জোবায়দা পারভীন।
যেহেতু চিকিৎসাসেবা নিয়ে ক্রমাগত গবেষণা হচ্ছে, সেবার মান উন্নত হচ্ছে, তাই এই গ্রন্থের পরবর্তী সংখ্যাগুলোতেও তথ্যের আপডেট অব্যাহত থাকবে।