প্রারম্ভিকা
গল্পের পেছনের গল্প
কখনো কখনো সামান্য কিছু বিষয় কাউকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। আমার শৈশব কেটেছে দেশের সর্ব উত্তরের অঞ্চলে, হিমালয়ের পাদদেশেÑ যার একদিকে বিশাল এভারেস্ট, অন্যদিকে সবুজে মোড়া প্রকৃতি। গ্রামীণ সেই পরিবেশে যখনই বৃষ্টি হতো, আমি ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতামÑ কখনো মাটির সোঁদা গন্ধের ঘ্রাণ নিতে, কখনো বা কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখতাম লজ্জাবতী গাছের পাতা কীভাবে স্পর্শে সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং একটু পরেই আবার প্রাণ ফিরে পায়। দারুণ উত্তেজিত ও কৌতূহলী আমি ভাবতাম- প্রকৃতিতে এমন আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটে? অনেক বছর পর আমি এসবের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলামÑ মাটির সেই সোঁদা গন্ধের কারণ ছিল জিওসমিন নামক এক ধরনের কেমিক্যাল যা একটি নোমায়েসেটিস (অপঃরহড়সুপবঃবং) নামক ব্যাকটেরিয়া মাটিতে উৎপন্ন করে আর বৃষ্টির পর সেটি বাতাসে ভেসে আমাদের নাকে এসে পৌঁছায়। অন্যদিকে, লাজুক লজ্জাবতী (গরসড়ংধ ঢ়ঁফরপধ) গুল্মের সেই নড়াচড়াকে বলা হয় সিসমোনাস্টিক মুভমেন্ট যা ইলেকট্রিক, হায়ড্রোডায়নামিক ও কেমিক্যাল তরঙ্গের সমন্বিত প্রবাহ দিয়ে সৃষ্টি।
এই ছোট্ট ঘটনাগুলো আমার জীবনের পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং যা পরবর্তিতে আমাকে জীববিজ্ঞানে পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ২০১৩ সালে উচ্চতর গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি তে এলাম। এসেই এখানকার বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে দেখে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ। এরপরে বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথে পোস্টডক্টরাল গবেষণায় থাকাকালীন ২০২০ সালের শুরুতে বিশ্বজুড়ে আঘাত হানে কোভিড-১৯ মহামারি। আমাদের চেনা জগতের সবকিছুই বদলে দিল মুহূর্তেই। এই মহামারি শুধু একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটই ছিল না; এটি ছিল বিজ্ঞান বোঝাপড়ারও একটি সংকট। বায়োমেডিক্যাল গবেষণায় পৃথিবীর প্রথম সারির দেশ আমেরিকাসহ অন্যসব উন্নত দেশে গবেষকরা একদিকে যখন নিরলসভাবে ল্যাবরেটরিতে কাজ করছিলেন, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং রেকর্ড গতিতে ভ্যাকসিন তৈরি করছিলেন, তখন অন্যদিকে সমান গতিতে ছড়িয়ে পড়ছিল ভুল তথ্য। অবাক হয়ে দেখছিলাম অনেক মানুষ মাস্ক পরতে বা ভ্যাকসিন নিতে অস্বীকার করছিল, এমনকি কেউ কেউ বিশ্বাস করছিল যে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে তাদের শরীরে ট্র্যাকিং ডিভাইস প্রবেশ করানো হচ্ছে!
এই মহামারি আমাদেরকে একটা বড়ো বাস্তবতার মুখোমুখি করে দিল। এই যুদ্ধ শুধু ভাইরাসের বিরুদ্ধে ছিল না; এটি ছিল ভয়, সন্দেহ এবং বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই। সেই সময়েই উপলব্ধি করলাম বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন আবিষ্কার করা নয়; বরং সেই জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্যভাবে পৌঁছে দেওয়া। দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করেছেন ডিএনএর ডাবল হেলিক্স থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের মৌলিক কণিকার সন্ধান পর্যন্ত। কিন্তু মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিল, এই জ্ঞান যদি গবেষণাগারের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, পে-ওয়ালের পেছনে আটকে যায় বা জটিল ভাষায় আবৃত থাকে, তবে তা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে খুব উপকারে আসে না। বিজ্ঞানের গভীরতা, কৌতূহল ও আবিষ্কারের মাহাত্ম্য যদি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো না যায়, তবে অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি বেড়েই চলবে।
আমার জন্য বিজ্ঞান সবসময়ই ব্যক্তিগত। ক্যানসারে আমার বাবা-মাকে হারিয়েছি। কিন্তু তাদের চিকিৎসায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমি গবেষণাপত্র খুঁজে দেখেছি, চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছি এবং সম্ভাব্য সর্বোত্তম পথ অনুসরণ করেছিলাম। কিন্তু সেই সময়ে আমি এটাও উপলব্ধি করেছি যে একজন গবেষক হিসেবে আমার এই সুবিধা থাকলেও অনেকেরই তা নেই। অনেকেই সঠিক তথ্য, সঠিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে উপকারী তথ্য আলাদা করতে হিমশিম খান। আর এই ইন্টারনেটের যুগে তো অপতথ্য আরেক মহামারি আকারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এইসব অভিজ্ঞতা আমার এই ধারণা দৃঢ় করেছে যে বিজ্ঞান শুধুমাত্র গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিৎ নয়Ñ এটি হওয়া উচিত সহজবোধ্য, সহজলভ্য এবং মানুষের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন আনার জন্য উপযোগী। বিজ্ঞানের প্রয়োজন সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার। প্রয়োজন সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য হবার। আর এই দায় বিজ্ঞানীদের।
এই বইটি আমার বিজ্ঞান ও সাধারণের মাঝে ব্যবধান দূর করার একটি ছোট্ট প্রচেষ্টা। সম্প্রতি আবিষ্কৃত ও প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কিছু গবেষণার কয়েকটি গল্পের মধ্য দিয়ে আমি আপনাকে একটি যাত্রায় নিয়ে যেতে চাই যেখানে আমি শুধু বিজ্ঞানের গল্প বলার মাধ্যমে আবিষ্কারের গল্পটিই নয়, কিছু প্রশ্নও রেখেছি আপনাদের অনুসন্ধিৎসু মনের জন্য এবং কীভাবে গবেষণায় প্রশ্ন করা হয় সেই চিত্রকেও ধারণ করার চেষ্টা করেছি। এখানে উঠে এসেছে সেই গবেষণা যেখানে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছে মানব দেহের সূচনা লগ্নে কীভাবে একটি ভ্রƒণ বিকশিত হয়, আমরা জানব সেই গবেষণার কথা যা জানাচ্ছে কীভাবে ডিএনএ আমাদের শরীর, আচরণ এবং এমনকি রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। আরো জানব মাতৃভাষার গভীর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য নিয়ে গবেষণা, ক্যানসারের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই, অথবা সমুদ্রের অতল থেকে উঠে আসা অক্সিজেনের রহস্য নিয়ে গবেষণার কথা। এখানে আছে চিকিৎসাশাস্ত্রের অভূতপূর্ব অগ্রগতি, মানব জিনের অজানা দিক, এমনকি আমাদের নিজেদের শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক অদেখা জগতের গল্প। জানব এমআরএনএ ভ্যাকসিনের বিপ্লবী অগ্রগতির গল্পও। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।