আহমদুল ইসলাম চৌধুরী রচিত ‘মোবারক স্মৃতি’ একটি আত্মজৈবনিক এবং ঐতিহাসিক ভ্রমণকাহিনি, যা মূলত ১৯১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের হজ্ব পালনের অভিজ্ঞতা ও বিবর্তনের একটি প্রামাণ্য দলিল।
১. গ্রন্থকার পরিচিতি ও পারিবারিক ঐতিহ্য
লেখক: আহমদুল ইসলাম চৌধুরী চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে সমাজসেবক, কলামিস্ট এবং ৩৯টি গ্রন্থের রচয়িতা।
পিতার অবদান: তাঁর পিতা খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী ছিলেন ব্রিটিশ আমলের দুইবারের পার্লামেন্ট সদস্য। তিনি ১৯১৯ সালে (তুর্কি আমলে) হজ্জে আকবর এবং ১৯৩৫ সালে ‘আমিরুল হজ্ব’ হিসেবে সাগরপথে হজ্ব পালন করেছিলেন।
প্রভাব: শৈশবে বাড়িতে আসা আরবীয় হজ্বযাত্রীদের আতিথেয়তা এবং পিতার হজ্ব-সংক্রান্ত লেখালেখি লেখককে মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত করে।
২. হজ্ব পালনের ব্যক্তিগত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা (১৯৭৫)
প্রচেষ্টা ও বাধা: লেখক ১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত কয়েকবার লটারিতে নাম না আসায় হজ্বে যেতে পারেননি। অবশেষে ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি হজ্ব পালন করেন।
ভ্রমণবৃত্তান্ত: বইটিতে ঢাকা থেকে দুবাই ও জেদ্দা হয়ে মক্কায় পৌঁছানো, মসজিদুল হারামে অবস্থান, এবং জান্নাতুল মুয়াল্লা যেয়ারতের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
ঐতিহাসিক স্থান দর্শন: সূচিপত্র অনুযায়ী, লেখক মক্কায় অবস্থানকালে জবলে নূর এবং জবলে আবু কুবাইস ভ্রমণ করেন। পরবর্তীতে মদিনা মুনাওয়ারা গমন করে বদর যুদ্ধক্ষেত্র যেয়ারত করেন।
৩. হজ্বের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব
লেখক প্রাচীনকালের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির হজ্ব সফরের বিবরণ সংকলন করেছেন:
গুলবদন বেগম (১৫৬৮): মোগল সম্রাট আকবরের ফুফু, যিনি সাত বছর সময় নিয়ে হজ্ব সম্পন্ন করেছিলেন।
নবাব ফয়জুন্নেছা (১৮৯৪): কুমিল্লার এই মহীয়সী নারী মক্কায় মাদ্রাসা ও মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
অন্যান্য মনীষী: চুনতীর মাওলানা আবদুল হাকিম (১৮৫৭), মগনামার ওয়াইজ উদ্দিন মুহুরী (১৯১২) এবং খান বাহাদুর আহসান উল্লাহর (১৯২০) হজ্ব সফরের ঐতিহাসিক তথ্য এখানে রয়েছে।
৪. আধুনিক প্রেক্ষাপট: করোনা মহামারী ও হজ্ব
বইটির ৩য় প্রকাশে করোনা মহামারীর কারণে হজ্বের প্রতিকূলতা নিয়ে একটি বিশেষ অংশ যোগ করা হয়েছে:
২০২০-২০২১ সালের হজ্ব: করোনা পরিস্থিতির কারণে ১৩৭ বছর পর হজ্বের উপর চরম বিধিনিষেধ আসে, যার পরিসংখ্যান ও লেখকের ওমরাহ পালনের অভিজ্ঞতা এতে স্থান পেয়েছে।
পরিসংখ্যান: ২০২০ সালে মাত্র ৯৩৭ জন এবং ২০২১ সালে ৫৮,৫১৮ জন হজ্ব করার সুযোগ পান।
৫. সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজ
লেখক কেবল ভ্রমণকাহিনী লেখেননি, বরং হজ্বযাত্রীদের সেবায় ২০০৭ সালে ‘হজ্বযাত্রী কল্যাণ পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
বইটিতে হজ্বের গুরুত্ব, হজ্ব ব্যবস্থাপনা এবং হজ্ব পরবর্তী জীবন নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা রয়েছে।
উপসংহার: ‘মোবারক স্মৃতি’ কেবল একটি ভ্রমণনামা নয়; এটি ১৯১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত হজ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তন, যাতায়াত বিড়ম্বনা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ দলিল।