উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং নায়ক কুবের মাঝি। তার সংসারে সে ই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্ত্রী মালা। মালা দেখতে এত সুন্দর না হলেও মোটামুটি সুন্দরী বলা চলে। তবে মালা জন্মগতভাবে পঙ্গু। কিন্তু তবুও কুবের তার স্ত্রীকে ভালোবাসে।
কপিলা এই উপন্যাসের নায়িকা। সম্পর্কে সে মালার বোন এবং বিবাহিত। কিন্তু তার স্বামীর সাথে তার মনের মিল হয় না। সে স্বামীর সংসার ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে আসে। আর বন্যার সময় সে মালার বাড়িতে বেড়াতে আসে। কুবের শ্যালিকা কপিলার প্রতি প্রেমের টান অনুভব করে। কপিলাকে নিয়ে সে আলাদা সংসার করার স্বপ্ন দেখে।
কপিলা চতুর, চঞ্চল এবং অত্যধিক বুদ্ধিসম্পন্ন মহিলা। সে কুবের তার প্রতি টান অনুভব করে এবং সময় পেলেই সে অনুভূতিকে উস্কে দেয়। আবার তার স্বামী তাকে ফেরত নিতে এলে সে বাধ্য স্ত্রীর মতো শ্বশুরবাড়ি ফিরে যায়।
উপন্যাসের রহস্যময় চরিত্র হোসেন মিয়া। সে প্রকৃতপক্ষে কি কাজ করে সে সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি। লোকমুখে প্রচলিত তিনি সমুদ্রের বুকে একটি জনমানবহীন দ্বীপ কিনেছে, যার নাম দিয়েছে ‘ময়নাদ্বীপ’। সে তার দ্বীপটিতে একটি জনসমাজ গড়তে চায়।
হোসেন মিয়ার চতুরতার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন সে সুকৌশলে কুবের মাঝিকে চুরির অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেয়। জেল খাটার ভয়ে কুবের মাঝি হোসেন মিয়ার শরণাপন্ন হয়। হোসেন মিয়া তখন তাকে ময়নাদ্বীপে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। কুবের সেখানে যেতে রাজি হলে কপিলাও কুবেরের সাথে যেতে চায়।
পুরো উপন্যাসে কপিলার কুবেরের প্রতি অনুভূতি নিয়ে দ্বিধা থাকলেও উপন্যাসের এসে স্পষ্ট হয় কপিলাও কুবেরকে ভালোবাসে এবং কুবেরের মতো সেও স্বপ্ন দেখে একসাথে সংসার করার। কুবের কপিলাকে ময়নাদ্বীপে নিতে সম্মত হলে তারা রওয়ানা দেয় ময়নাদ্বীপের উদ্দেশ্যে—ফেলে রেখে তাদের সমস্ত অতীত।
শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, নিয়তিবাদ ইত্যাদি বিষয়কে লেখার মধ্যে তুলে এনে বাংলা সাহিত্যে যিনি অমর হয়েছেন, তিনি হলেন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক ১৯০৮ সালের ১৯ মে বিহারের সাঁওতাল পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, আর মানিক ছিলো তাঁর ডাকনাম। বাবার বদলির চাকরিসূত্রে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও ছাত্রজীবন কেটেছে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের পটভূমিতে বিভিন্ন সাহিত্য রচনা করেছেন তিনি। প্রবেশিকা ও আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গণিত বিষয়ে অনার্স করতে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এখানে পড়াশোনাকালে বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে তিনি 'অতসী মামী' গল্পটি লেখেন। সেই গল্পটি বিখ্যাত 'বিচিত্রা' পত্রিকায় ছাপানো হলে তা পাঠকনন্দিত হয় এবং তিনি সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সাহিত্য রচনায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন, যার ফলে তাঁর পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং তিনি আর পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। তাঁর হাতে বাংলা সাহিত্যে এক বৈপ্লবিক ধারা সূচিত হয় ঐ সময়ে, যখন সারা পৃথিবী জুড়ে মানবিক বিপর্যয়ের এক চরম সংকটময় মুহূর্ত চলছে। কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকে যাওয়ায় তাঁর লেখায় একসময় এর ছাপ পড়ে এবং মার্ক্সীয় শ্রেণীসংগ্রাম তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই সমগ্র। ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষণেরও প্রভাব লক্ষ্য করা যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র-তে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই সমূহ এর মধ্যে 'পদ্মানদীর মাঝি', 'দিবারাত্রির কাব্য', 'পুতুলনাচের ইতিকথা', 'শহরতলি', 'চতুষ্কোণ', 'শহরবাসের ইতিকথা' ইত্যাদি বিখ্যাত উপন্যাস, এবং 'আত্মহত্যার অধিকার', 'হারানের নাতজামাই', 'বৌ', 'প্রাগৈতিহাসিক', 'সমুদ্রের স্বাদ', 'আজ কাল পরশুর গল্প' ইত্যাদি গল্পগ্রন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা রচনার কিছু নিদর্শন থাকলেও সেগুলো তেমন উল্লেখযোগ্যতা অর্জন করেনি। অসামান্য এই কথাসাহিত্যিক মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।