পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে যিকর ও কুরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়েছেন। যিকর হলো, গাফ্লাত তথা অমনোযোগিতা, উদাসীনতা ও অন্যমনস্কতা দূরীকরণ। আর উদাসীনতা ও অন্যমনস্কতার কারণে অন্তর কঠোর হয়ে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেক শরী‘আত সম্মত বিষয় সেটি কথার মাধ্যমে হোক বা কাজের মাধ্যমে হোক অথবা চিন্তা ও ধ্যানের মাধ্যমে হোক, যা ইখ্লাস ও একনিষ্ঠ ধ্যান এবং উপস্থিত অন্তরসহ কেবল আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই হবে তাই যিকর। আর যা ইখলাস বা একনিষ্ঠ ধ্যান বিহীন হবে, তা র্শিকি খফী তথা গোপন র্শিক। আর যা উদাসীনতা ও অন্যমনস্কতা সহকারে হবে তা আল্লাহ তা‘আলার নিকট মূল্যায়ন হবে না এবং গ্রহণীয়ও হবে না।
“যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয় (সূরাতুর রা‘দ, ১৩ : ২৮)।” “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর যিকর করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অতঃপর কুমন্ত্রণা দেয়। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা। যিকরের মাধ্যমে মানুষের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। আর যিকর হলো, পাপ ও গুনাহ্ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য কার্যকর ঔষধ এবং সফল চিকিৎসা। সুতরাং যে ব্যক্তিকে অস্থিরতা খণ্ড বিখণ্ড করল ও দুশ্চিন্তা দুর্বল করে ফেলল এবং বিষণ্নতার দহনে নির্যাতিত এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তার একমাত্র উপায় হলো যিকর ও তিলাওয়াতুল কুরআন; কেননা যিকর বিষণ্নতার পাহাড়কে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয় এবং দুঃখ-দুশ্চিন্তার মেঘসমূহকে দূরীভূত করে দেয়। আল্লাহ তা‘আলার যিকর করলে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে বেশি বেশি যিকর ও সৎকর্ম সম্পাদন করার তাওফীক দান করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“সুতরাং তোমরা আমাকেই স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং কৃতঘ্ন হইও না” (সূরাতুল বাকারাহ্, ২ : ১৫২)। “ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্টভাবে তাঁরই প্রতি মগ্ন হও (সূরাতুল মুয্যাম্মিল, ৭৩ : ৮)।” মানব জাতির শত্রু ইবলীস সর্বদা মানুষকে প্ররোচনা দিয়ে মানুষের মনের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহ তা‘আলার নাফারমানিতে জড়িয়ে ফেলে। অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার পর মু’মিন ব্যক্তির হৃদয়ে অপরাধবোধ জাগ্রত হয় এবং অপরাধ ও পাপের বোঝা হতে মুক্ত হবার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠে। সত্যিকার মু’মিনের এরকমই হওয়া উচিত। অন্যথায় মহান আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত ভয়াবহ শাস্তির সম্ভাবনা থাকে। বর্ণিত আছে, এক বুজুর্গ স্বপ্নে শয়তানকে দেখলেন। শয়তান খুবই ব্যস্ত ও চিন্তিত। জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার তুমি এত চিন্তিত? সে বলল, আমি আল্লাহ তা‘আলার একজন বান্দাকে অনেক কষ্টের মাধ্যমে একটি পাপ করাই, করার পর সে অনুতপ্ত হয়, সে আবার তাওবা করে ফেলে।
আমি এক সপ্তাহ চেষ্টা করে তার মাধ্যমে একটি গুনাহ করালাম, তাওবা করার মাধ্যমে সে যেন আমার কোমরে একটি লাথি দেয়। কারণ, আমি তার মাধ্যমে যে গুনাহ করালাম তাওবার কারণে সে গুনাহ মাপ হয়ে গেল।
এত কষ্ট নিমিষেই সে নষ্ট করে দিল। এ জন্য আমি চাই যে, লোকেরা তাওবা না করুক। এমতাবস্থায় মু’মিন ব্যক্তির প্রধান কাজ হচ্ছে তাওবা-ইস্তিগফার করা অর্থাৎ পাপকর্ম হতে ফিরে আসা এবং কৃত পাপকর্মের জন্য মহান আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। মু’মিনদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভের হাতিয়ার হলো, যিকর ও কুরআন তিলাওয়াত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান দায়িত্বসমূহের মধ্যে একটি দায়িত্ব হলো, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা। এতে বোঝা যায় যে, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা হলো একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যেমন আমি পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে একজন রাসুল, যিনি তোমাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন এবং তোমাদের পবিত্র করেন; আর তোমাদের শিক্ষা দিবেন কিতাব ও তাঁর তত্ত্বজ্ঞান এবং শিক্ষা দিবেন এমন বিষয় যা তোমরা কখনো জানতে না (সূরাতুল বাকারা, ২ : ১৫১)।”
“আল্লাহ ঈমানদারদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। (সূরাতু আল ইমরান, ৩ : ১৬৪)।” “তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্য হতে, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতোপূর্বে তারা তো ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত (সূরাতুল জুমু‘আহ্, ৬২ : ২)।” “হে আমার প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন রাসুল প্রেরণ করুন যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন।
নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী পরম প্রজ্ঞাময় (সূরাতুল বাকারা, ২ : ১২৯)।” “আল্লাহর নিকট হতে একজন রাসুল, যিনি তিলাওয়াত করেন পবিত্র গ্রন্থ” (সূরাতুল বায়্যিনা, ৯৮ : ২)। “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন উপদেশ। একজন রাসুল, যিনি তোমাদের নিকট আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, যারা মু’মিন ও সৎকর্মপরায়ণ তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে বেরিয়ে আনবার জন্য (সূরাতুত তালাক, ৬৫ : ১০-১১)।” উল্লেখিত ছয় স্থানে মু’মিনদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলো, আল্লাহ তা‘আলার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করা এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়া। মুফতী শফী (র.) বলেন, নবি-রাসুল প্রেরণের অর্থ চারটি, উপরোক্ত সূরাতুল বাকারা, সূরাতু আলে-ইমরান এবং সূরাতুল জুমু‘আর আলোচ্য আয়াতসমূহে রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে একই বিষয়বস্তু অভিন্ন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জগতে পদার্পণ ও তাঁর রিসালতের চারটি লক্ষ বর্ণিত হয়েছে: (১) কুরআন তিলাওয়াত, (২) আসমানী কিতাব শিক্ষাদান, (৩) হিকমত শিক্ষাদান এবং (৪) মানুষের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠন।
উপরোক্ত আয়াতসমূহে সাধারণ পাঠ্যক্রম ধারা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এটি এমন নীতি যার কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন সমীচীন নয় এবং এই নীতির বিকল্পও নেই। যেই নীতির মাধ্যমে মানুষের ইহকাল ও পরকালে সফলতা সুনিশ্চিত। যেহেতু এটি জ্ঞানের আধার, মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। যিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা; যিনি তার সৃষ্টির প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত এবং মানুষের আত্মা ও তার পরিবর্তনের সমস্ত বিষয়াবলি সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত। আমাদের ধর্মীয় পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর শিক্ষা এবং দাওয়াত পদ্ধতিও এই নীতির ওপর বহাল ছিল। যা সূরাতুল বাকারার ১২৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। “মু’মিন তো তারাই যাদের হৃদয় প্রকম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন উহা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে। আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং তাঁর রাসুলকে তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “তুমি তিলাওয়াত কর কিতাব হতে যা তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয় এবং সালাত কায়িম কর। সালাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কার্য হতে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন (সূরাতুল আনকাবূত, ২৯ : ৪৫)।”
অত্র গ্রন্থে যিকর ও কুরআন তিলাওয়াতের মহত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।