মুফাক্কিরে ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.কে আল্লাহ পাক এ আখেরী যমানায় দ্বীনের যে বহুমুখী খেদমতের তাওফীক দিয়েছেন এবং তাঁর যবান ও কলম পুরো আলমে ইসলাম জুড়ে বরং অমুসলিম-সমাজেও দ্বীনী দাওয়াত যে হৃদয়গ্রাহী পন্থায় পৌঁছে দিয়েছে সে সম্পর্কে কোনো সচেতন মুসলমান অনবহিত নন।
আল্লাহ পাক হযরত মাওলানাকে উম্মতের প্রতি এমন দয়ার্দ্রচিত্ত বানিয়েছিলেন যে, তিনি পতনের এই যুগে উম্মাহর গাফলত ও আত্মঘাতী অবস্থাদর্শনে অস্থির হয়ে পৃথিবীর প্রায় সকল রাষ্ট্রেই ছুটে বেড়িয়েছেন। অন্তরের সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে মুসলমানদের গাফলতের নিদ থেকে জাগিয়ে আত্মসচেতন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছেন। বিশেষত উম্মাহর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব যাদের হাতে সে সকল নেতৃবৃন্দ ও উলামায়ে কেরাম ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যাদের হাতে সেই সকল যুবক ও তালেবানে ইলমের
পরিচিতি, মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তো তিনি স্বীয় ব্যথিত হৃদয়কেই তাদের সামনে খুলে রেখে দিয়েছেন।
যদিও ভাষণ সমগ্রের প্রথম খণ্ডটি বিশেষভাবে উলামায়ে কেরাম ও তালেবান ইলমের জন্য কিন্তু ব্যাপকভাবে মুসলমানমাত্রের জন্যই এতে চিন্তার খোরাক আছে। আছে হৃদয়ে উত্তাপ গ্রহণের পর্যাপ্ত সামান।
ভাষণ সমগ্রের দ্বিতীয় খণ্ড ‘দাওয়াত ও তাবলীগ’ শীর্ষক গ্রন্থখানি বিশেষভাবে উলামায়ে কেরাম ও দাঈ-এ ইসলামের জন্য রাহবারস্বরূপ। এ খণ্ডেও ব্যাপকভাবে মুসলমানমাত্রের জন্যই চিন্তার খোরাক আছে। আছে নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা লাভের পর্যাপ্ত সামান। সাথে সাথে উম্মাহর দরদ অন্তরে সৃষ্টি করে সমগ্র পৃথিবী তথা কুল-মাখলুকের কল্যাণে কাজ করার প্রেরণা হাসিলের উপকরণ। অতএব ভাষণ সমগ্রের সবক’টি খণ্ডই সকলের পাঠ করা উচিত।
আল্লাহর পথের এক মহান দাঈ,ইলমে ওহীর বাতিঘর যুগশ্রেষ্ঠ মনীষী। খাঁটি আরব রক্তের গর্বিত বাহক।বিশ্বময় হেদায়েতের রোশনি বিকিরণকারী।উম্মতের রাহবর ও মুরুব্বি। কল্যাণের পথে আহ্বানে চিরজাগ্রত কর্মবীর। জন্ম ১৯১৪ ঈসাব্দে। ভারতের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সূতিকাগার উত্তর প্রদেশের রাজধানী লাখনৌর রায়বেরেলীতে। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া আদ্যোপান্তই দারুলউলুম নদওয়াতুল উলামায়। অধ্যাপনা জীবনের সিংহভাগও এই প্রতিষ্ঠানে নিবেদিত ছিলেন। আল্লামা নদভীর খ্যাতির সূচনা হয় বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে "সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ" রচনার মাধ্যমে।গ্রন্থটি গোটা ভারতবর্ষে তাকে পরিচিত করে তুলে।এরপর তিনি রচনা করেন 'মা যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন' (মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারাল) নামক কালজয়ী গ্রন্থ।যা তাকে প্রথমত আরববিশ্বে ও পরবর্রতীতে বৈশ্বিক সুখ্যাতি এনে দেয়। এ পর্যন্ত গ্রন্থটির শতশত সংস্করণ বের হয়েছে। বিগত প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ধরে তার কলম অবিশ্রান্তভাবে লিখেছে মুসলিম ইতিহাসের গৌরদীপ্ত অধ্যায়গুলোর ইতিবৃত্ত। সীরাত থেকে ইতিহাস, ইতিহাস থেকে দর্শন ও সাহিত্য পর্যন্ত সর্বত্রই তার অবাধ বিচরণ। উর্দু থেকে তার আরবী রচনায় যেন অধিকতর অনবদ্য। আল্লামা নদভী জীবনে যেমন পরিশ্রম করেছেন, তেমনি তার শ্বীকৃতিও পেয়েছেন। মুসলিম বিশ্বের নোবেল হিসেবে খ্যাত বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে দুবাইয়ে তিনি বর্ষসেরা আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হন।১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সেন্টারের পক্ষ থেকে আলী নদভীকে সুলতান ব্রুনাই এ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক বহু ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সদস্য ছিলেন। তিনি একাধারে রাবেতায়ে আলমে ইসলামী এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সেন্টারের সভাপতি ছিলেন। লাখনৌর বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুলউলুম নাদওয়াতুল-উলামা' এর রেকটর ও ভারতীয় মুসলনমানদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম মুসলিম পারসোন্যাল ল' বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। ইসলামের এই মহান সংস্কারক ১৯৯৯ সনের ৩১ ডিসেম্বর জুমার আগে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াতরত অবস্থায় ইন্তিকাল করেন।