মোরশেদ ইকবাল—ছড়া, কবিতা ও গল্পের এক সৃজনশীল ধারাবাহিকতায় নিজস্ব কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া এক সাহিত্যিক স্বাক্ষর। জন্ম মহান স্বাধীনতার উষালগ্নে, ফেনী শহরের আহমেদ ভিলা, ডাক্তার পাড়ায়। পিতা প্রয়াত খায়েজ আহমেদ ও মাতা প্রয়াত আনোয়ারা বেগম—এক সাংস্কৃতিক অনুরাগী পরিবারে বেড়ে ওঠা এই সাহিত্যপ্রেমিকের শৈশবেই সাহিত্যবীজ বোনা হয় আত্মায়। পরিবারের অগ্রজদের মধ্যে নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন তাঁর মামা এবং লেখক সুষমা নার্গিস স্বপ্না তাঁর বোন—এই আত্মীয় বন্ধনই মোরশেদ ইকবালের লেখালেখির ভিত গড়ে দেয়।
মাত্র বার বছর বয়সে তার প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। ছড়ার মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে কবিতা ও গল্প লেখায়ও তিনি সমান দখল দেখিয়েছেন। শিশুতোষ ছড়ার পাশাপাশি তিনি সমাজ, রাষ্ট্র ও সময়ের সংকট নিয়ে লেখেন তীক্ষ্ণ ও দায়বদ্ধ ছড়া—যা শিশুসাহিত্যকে পূর্ণবয়স্ক পাঠকের দিগন্তেও নিয়ে গেছে। তার ছড়া শুধু ছেলেমানুষের খেলার বিষয় নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, প্রেম, স্বদেশচেতনা ও মানবিক উপলব্ধির কাব্যিক ভাষ্য।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
গল্পগ্রন্থ: চক্রাবর্ত, গল্পের মতো
ছড়াগ্রন্থ: মনকাড়া কাব্যছড়া, হরেক রকম ছড়া
কবিতার বই: বিনীতা ও এক শ্রাবণ রাত্রি
প্রকাশ-অপেক্ষিত স্মৃতিগদ্য: পারিবারিক অ্যালবামে ড. সেলিম আল দীন
তিনি ফেনীর সাহিত্যাঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তার লেখা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ছড়া চর্চায় তার স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাহসী ব্যঞ্জনা তাকে করেছে আলাদা। এছাড়া তিনি ছিলেন অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগনের ফেনী জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান।
সাহিত্যিক হিসেবে তিনি যেমন নির্মোহ, তেমনি গভীরভাবে জীবন ও সমাজের প্রতি সংবেদনশীল। শিশুতোষ সাহিত্য, নাগরিক জীবন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাসচর্চা—সবক্ষেত্রে তার সাহিত্যচিন্তা ছিল অন্তর্দৃষ্টি ও দায়বদ্ধতায় পরিপূর্ণ।
মোরশেদ ইকবাল ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরলোক গমন করেন। তার প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারিয়েছে এক প্রতিশ্রুতিশীল ও মননশীল কবিকণ্ঠ। তবে তার রচনাবলি আগামী দিনের পাঠকের হৃদয়ে তিনি চিরজীবী হয়ে থাকবেন—এক শব্দসৈনিক হিসেবে।