বিপ্লবী কমরেড আবদুশ শহীদের জন্ম ১৯১৭ সালের ১৭ নভেম্বর বরিশাল জেলার চাখারের বলহার গ্রামে। পিতা মুনশী মোহাম্মদ আফতাব উদ্দীন, মাতা কাজী হামিদা। পিতা ছিলেন ধার্মিক এবং সাহিত্যপ্রাণ মানুষ। কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখতেন। আবদুশ শহীদরা ছয় ভাই-বোন। বড় ভাই মওলানা হাফিজুদ্দিন ফিরুজী সাহেব প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। বরিশাল শহর থেকে তিনি আল-ঈমান নামে একটি পত্রিকা বের করতেন ত্রিশ এর দশকে। এ পত্রিকায় পিতা আফতাব উদ্দীনের অনেক কবিতা ছাপা হয়েছে। মেঝভাই মাওলানা নুরুদ্দীন আহমদ বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে তার বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বড় বোন। নুরুন্নেসা। মেঝবোন হুরুন্নেসারও লেখালেখির হাত ছিল। জীবনের সেই দিনগুলি নামে তার একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ছোট বোন সৈয়দুন্নেসা ছিলেন আবদুশ শহীদের যমজ। শৈশব: জন্মের দু'বছরের মাথায় মাকে হারান আবদুশ শহীদ। মায়ের স্মৃতি বলতে বড়ির উঠানে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি অবয়বই শুধু মনে করতে পারতেন তিনি। মেঝ বোন হুরুন্নেসাই কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন তাকে। শর্ষিণা পীরের অন্যতম অনুসারী মোঃ এমদাদুল হকের সঙ্গে হুরুন্নেসার বিয়ে হলে বোনের সঙ্গে শর্ষিণা চলে যান আবদুশ শহীদ। শৈশবে খুব বেশি দুরন্তপনার সুযোগ না থাকলেও ফুটবল খেলার প্রতি ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। মাদরাসা থেকে আধাবেলা ছুটি পেলেই শর্ষিণা থেকে লঞ্চে চেপে, মাইলের পর মাইল হেঁটে খলিশাকোঠায় চলে আসতেন ফুটবল খেলার নেশায়। মাদরাসার কঠোর অনুশাসনে অচিরেই হাঁপিয়ে ওঠে আবদুশ শহীদের শৈশব। শিক্ষা: শর্ষিণার পীর পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকায় মাদ্রাসা থেকে আবদুশ শহীদের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। কিছুতেই মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি অনুরাগী হতে পারছেন না দেখে মেঝ ভাই মওলানা নূরুদ্দীনের প্রচেষ্টায় খলিশাকোঠা হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৪০ সালে সাফল্যের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। ১৯৪২ সনে চাখার কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে আই এ পাস করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৪৫ সনে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন। গ্রাজুয়েশনের জন্য বরিশাল বি এম কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু শ্রদ্ধাভাজনদের অনুরেধে পুনরায় চাখার কলেজে ফিরে আসেন। এম এ প্রথম পর্ব। ভালোভাবে শেষ করলেও পার্টি নির্দেশে দ্বিতীয় পর্ব পাশ করা হয়নি আবদুশ শহীদের। পার্টি নির্দেশে চলে যান গোপন জীবনে। রাজনীতি চর্চা: শৈশব থেকেই মুক্ত মনের অধিকারী আবদুশ শহীদ স্কুলের ছাত্রাবস্থায়ই বাম রাজনীতির প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং ১৯৪৩ সনে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন শোষিতের ভাগ্য পরিবর্তনের দুর্বার আকাঙ্ক্ষার শেকলে। ৪০এর ভয়াবহ মন্বন্তরে গ্রামে গ্রামে বিরামহীন ঘুরে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য কাজ করেছেন। পাক-ভারত স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে বৃটিশ সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে কঠোর গোপন জীবন যাপন করতে হয় তাকে। '৪৭ এর স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রথম ঢাকা আগমণ এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবে ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিবাদ। ভাষার দাবীতে গ্রাম-গঞ্জের ছাত্র-শিক্ষক-জনতাও উদ্বেল হয়ে ওঠে। ভাষার এ দাবীকে সংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করার অভিপ্রায় পশ্চিম বাখরগঞ্জ ছাত্র সম্মেলন আয়োজনের ফলস্বরূপ ১৯৪৮ সালে গ্রেফতার হন আবদুশ শহীদ। গ্রেফতার হয়ে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছর কারাভোগ করেন। কারাভোগের এ সময়কালেই ১৯৫০ সনের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চালনার নারকীয় হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। গুলিবিদ্ধ হয়েও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। এই হত্যাযজ্ঞসহ ৭ বছরের জেলজীবন নিয়েই রচিত হয় কারাস্মৃতি। '৬৯ এর গণ আন্দোলনসহ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে সার্বিক অংশগ্রহণ করেছেন দেশের অভ্যন্তরে থেকেই। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও ব্যক্তি মার্কসবাদী হিসেবে নিজের প্রতি বিশ্বাস আমৃত্যু লালন করেছেন তিনি। বিবাহ: রাজনীতি অন্তপ্রাণ আবদুশ শহীদের অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনকে গ্রহণ করতে না পেরে প্রথম স্ত্রী তাকে ছেড়ে যান। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সনে রাজনীতি সচেতন রাজিয়া শহীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বোহেমিয়ান যাবদুশ শহীদের সংসারী জ্ঞান তেমন না থাকলেও স্ত্রী রাজিয়া শহীদের সহায়তায় তিন সন্তান তানিয়া, জয়া ও পাভেলকে নিয়ে পরবর্তীতে কিছুটা সুস্থির জীবন কাটান আবদুশ শহীদ। তানিয়া শহীদ ও জয়া শহীদ সাংবাদিকতার সাথে জড়িত। কর্মজীবন: মেহনতি মানুষের মুক্তির আকাঙ্খায় কলকাতা পোর্টের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পদে চাকুরীর প্রস্তাব, সওগাত পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগের চাকুরীসহ বহু লোভনীয় প্রস্তাব পার্টির নির্দেশে বিনা প্রশ্নে ত্যাগ করেছেন আবদুশ শহীদ। চল্লিশের দশকে গ্রাজুয়েশন সমাপ্ত করেও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার উদ্দেশে শিক্ষকতাকেই আদর্শ ভেবে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকাকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। বৃহত্তর বরিশালের ভবানীপুর, উজিরপুর, কালিপূরী, মোমিনপুর, পাথরঘাটা, ধামুরা, কাকর, বড় বাইশদিয়া, মুলাদি, ভাসানচর, কাউয়ারচর, বাকপুর, হোগলা, ষোলক, বড়কোঠা, গাববাড়ি, কলসকাঠি, কর্ণকাঠি, গাবা স্কুলসহ অসংখ্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহ প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজ হাতেও গড়ে তুলেছেন অসংখ্য স্কুল ও পাঠাগার। বরিশাল ছাড়াও বিক্রমপুরের লৌহজং, ষোলঘর, রুশদীসহ ঢাকার বেশ কয়েকটি স্কুলেও শিক্ষকতা করেছেন তিনি। যে কারণে সারাদেশের ছড়িয়ে আছে তার অসংখ্য ছাত্র। যাদের স্মৃতিতে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবেই তিনি বেঁচে আছেন আজও। স্বাধীনতার পর বরিশালের শিক্ষকতা ত্যাগ করে ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। শিক্ষকতা ছাড়া আবদুশ শহীদের জীবন একটি অংশ কেটেছে সাংবাদিকতা পেশায়। কাজ করেছেন প্রাচ্য বার্তা, গণকণ্ঠ, দৈনিক দেশ, হলিডেসহ বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি কলাম লেখেন সংবাদ, দৈনিক আজাদ, দৈনিক বাংলা, ভোরের কাগজ, আজকের কাগজসহ অসংখ্য দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়। একুশে ফেব্রুয়ারী এলেই বইমেলায় পাতলা ছিপছিপে মাঝারী গড়নের লালচে-ফর্সা বৃদ্ধলোক কমরেড আবদুশ শহীদ, কাঁধে ঝোলানো চটের ব্যাগ, চোখ -মুখে অব্যক্ত প্রতিচ্ছবি নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতেন আর সবাইকে এক টুকরা কাগজ ধরিয়ে দিতেন। সেই কাগজের টুকরা প্রায় সকলেই নিতেন। এভাবে সমস্ত দিন পার করে দিতেন। অসংখ্য মানুষকে দিতেন। কাগজ টুকরায় সিলমারা অক্ষরে লেখা থাকতো “আপনার সন্তানের নাম বাংলায় রাখুন"। শহীদ ভাইয়ের সহধর্মিনী রাজিয়া শহীদ বলেছিলেন, “প্রতি বছর বইমেলায় তিনি এই কাগজগুলো দিতেন। ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে বাসায় বসে ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে সারারাত ধরে কাগজে সিল মেরে ব্যাগে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারী খুব ভোরে বেড়িয়ে পড়তেন। ওই কাগজগুলো বিলি করে রাতে বাসায় ফিরতেন”। ৯০ এর দশকে তিনি একুশে বইমেলায় নিজের লেখা বই কাঁধের ব্যাগে ঝুলিয়ে ফেরি করে বিক্রি করতেন। তিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন যাপন করেও কখনো আদর্শচ্যূত হননি সাহিত্য চর্চা: ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। পড়াশুনা করতে পছন্দ করতেন প্রচুর। দীর্ঘ ৭ বছরের কারাজীবনে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন সাহিত্য চর্চায়। জেলখানায়, জেলের বাইরে কবিতা লিখেছেন বেশ কিছু। যদিও তা খুব একটা সংরক্ষণ। করতে পারেননি নিজের বোহেমিয়ান জীবনের কারণে। তথাপি যে কয়েকটি কবিতার পরিচয় পাওয়া যায় তাতে বিপ্লবের ছোঁয়া আদ্যপান্ত। জীবদ্দশায় প্রায় ১০টির মতো পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে আবদুশ শহীদের। খাপড়া ওয়ার্ডে শহীদ আনোয়ার এর জীবনী রচনা করেছিলেন। কিন্তু নিজের অসুস্থতার সময়ে সেটি হাতছাড়া হয়ে যায় তাঁর। তিনি একজন শক্তিশালী লেখক ছিলেন। তাঁর লেখা গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘কারাস্মৃতি’, ‘আত্মকথা’, ‘খাপড়া ওয়ার্ডে রক্তলাল দিনগুলো’ প্রভৃতি। অনুবাদ ও সম্পাদনা: মৌলিক সাহত্যি চর্চার পাশাপাশি বেশকিছু বইয়ের অনুবাদ করেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে চেন চ্যাঙভেঙ এর মাও সেতুঙ ও লং মার্চ, ওয়াং মো'র যৌবনের গান ইত্যাদি। তাছাড়া কাহলিল জিবরানের একটি বই অনুবাদ শুরু করলেও অসুস্থতার জন্য সেটি শেষ করতে পারেননি। নিজে সম্পাদনা করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কিছু গণমুখী কবিতা নিয়ে পুস্তক প্রকাশ করেন ১৯৯৪ সনে। কীর্তনখোলা নামে একটি সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। সম্মাননা: শেরে বাংলা পদক, বরিশাল বিভাগ সমিতি পদক লাভ করেন মৃত্যুর পরে। জীবদ্দশায় ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সামবেশ থেকে তাকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। মৃত্যু: ১৯৯৬ সনে বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় ৬ মাস অসুস্থ থেকে ১৯৯৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নীতির সাথে আপোষহীন, হার না মানা এ ত্যাগী বিপ্লবীর মহাপ্রয়াণ ঘটে।