বশীর আল হেলালের "আনারসের হাসি" নিছক একটি গল্পগ্রন্থ নয়, এটি আমাদের সময়, সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের মনোজগৎকে হাস্যরসের আড়ালে এক নির্মম আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার সাহসী প্রয়াস। এই বইয়ে সংকলিত প্রতিটি গল্প যেন আমাদের চেনা বাস্তবতার মধ্যেও অচেনা কিছু খোঁজার যাত্রা—যেখানে হাসির আড়ালে জমে থাকে হাহাকার, সরল বর্ণনার পেছনে লুকিয়ে থাকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। ‘আনারস’ যেমন বাইরের থেকে আকর্ষণীয়, কিন্তু কাঁটাযুক্ত খোসার ভেতরে থাকে টক-মিষ্টি বিস্ময়, তেমনি এই গল্পগুলিও বাহ্যিকভাবে মজার, হালকা, সাবলীল মনে হলেও গভীরে প্রবেশ করলেই টের পাওয়া যায় লেখকের ভাষা, সমাজচেতনা ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের প্রখরতা।
বশীর আল হেলাল তাঁর লেখনীতে সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, সংকট, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক অসংগতিকে এমনভাবে গেঁথেছেন যে, পাঠক গল্প পড়তে পড়তে হেসে ওঠে, আবার হঠাৎ থমকে গিয়ে চিন্তায় ডুবে যায়। তাঁর ভাষা সহজ, কিন্তু ভাবনায় গভীর; তাঁর চরিত্ররা যেন পাশের বাড়ির মানুষ, কিন্তু গল্পের শেষে তারা যেন একেকটা প্রতীক হয়ে ওঠে বৃহত্তর বাস্তবতার। "আনারসের হাসি" আসলে সেই জাদুকরি সাহিত্য, যেটা পাঠকের মুখে হাসি ফোটায়, কিন্তু মনে চিন্তার ঢেউ তোলে। এই বই পড়া মানে কেবল বিনোদন নয়—এ এক উপলব্ধির অভিজ্ঞতা।
যারা বাংলা ছোটগল্পে নতুন স্বাদ খুঁজছেন, বা হাসির গল্পের মধ্যেও জীবন ও সমাজের অন্তর্লীন সত্য ধরতে চান, তাঁদের জন্য "আনারসের হাসি" হবে অবধারিত একটি পাঠ্য। এটি এমন এক বই, যা একবার শুরু করলে শেষ না করে রাখা যায় না—আর শেষ করার পরও থেকে যায় একটা তীক্ষ্ণ অনুভব: “এই হাসির ভেতরে এমন করুণ রস কোথা থেকে এলো?” —এই প্রশ্নই পাঠককে বইয়ের পাতায় বারবার ফিরিয়ে আনে। তাই বইপ্রেমীদের জন্য এটি শুধু সংগ্রহে রাখার মতো বই নয়, বারবার পড়ার মতো সাহিত্যের সম্পদ।