হযরত রাবেয়া বসরী ছিলেন একজন উচ্চমার্গীয় মহিলা মুসলিম সাধক এবং সুফী ব্যক্তিত্ব। ইরাকের বসরা নগরীতে এক দরিদ্র পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে বহু মতভেদ রয়েছে। তিনি ৯৫ হিজরী, মতান্তরে ৯৯ হিজরির ৭১৯ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ইরাকের বসরা নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ইসমাঈল এবং মাতার নাম মায়ফুল। তারা দরিদ্র এবং পরম ধার্মিক ছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত নারী হিসেবে পরিচিত রাবেয়া তার উচ্চ নৈতিকতা এবং ধার্মিকতার জন্য সুপরিচিত। একজন নিবেদিতপ্রাণ তপসী হিসেবে, যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কেন তিনি দিন ও রাতে হাজার বার প্রথাগত সিজদা করেন, তখন তিনি উত্তর দেন, 'আমি এর জন্য কোনো পুরস্কার কামনা করি না; আমি এটা করি যাতে আল্লাহর প্রেরিত রসুল মোহাম্মদ (সা:)-এর উপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন।' রাবেয়া বসরী ছিলেন ভদ্র, নম্র ও সংযমী। সেই সাথে প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারিণী। সব সময় গভীর চিন্তায় ধ্যানমগ্ন হয়ে যেতেন। রাগ, হিংসা, অহংকার তার চরিত্রকে কখনো কলুষিত করতে পারেনি। মোটকথা আল্লাহর একজন প্রকৃত ওলী হবার জন্য যা যা গুণাবলি থাকা প্রয়োজন সকল গুণের অধিকারিণী ছিলেন হযরত রাবেয়া বসরী (রা.)। রাবেয়া বসরী সকল বিপদ-আপদকে পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতেন। রাবেয়া বসরী দাসত্ব জীবনও অতিবাহিত করেছেন। তার মনিব ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক। সে বিরামহীনভাবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে যেতেন। মনিবের নির্ধারিত কাজ শেষ করার পর মহান রবের ইবাদতে মশগুল হয়ে যেতেন। মূলত রাবেয়া বসরীর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভ করা। আল্লামা ফরিদ উদ্দীন সাত্তারের মতে, এক রাতে রাবেয়া যখন আল্লাহর আরাধনায় লিপ্ত ছিলেন, তখন তার মাথার ওপর কোনো শিকল দিয়ে বাঁধা ছাড়াই একটি ঝাড়বাতি জ্বলছিল। যার আলো বিচ্ছুতি হয়ে ঘরের চারপাশ আলোকিত হয়ে গেল। এ ঘটনা দেখে মনিবের পাষাণ হৃদয় গলে গেল। মনে মনে বললো, হায়! এ আমি কাকে আমার ঘরে দাসী বানিয়ে রেখেছি। সে তো সামান্য নারী হতে পারে না, সে আল্লাহর প্রিয়জন। পরদিন সকালে মনিব রাবেয়া বসরীকে দাসত্ব জীবন থেকে মুক্ত করলেন। তিনি আমৃত্যু তার মুদির হিসেবে থেকে গেলেন। পরবর্তী জীবনে রাবেয়া একজন কবি হিসেবেও প্রসিদ্ধ লাভ করেন। তার কবিতা পড়লে যে কেউই আল্লাহ্ প্রেমিক হয়ে উঠবে। রাবেয়া বসরীর জীবন থেকে অনেক কারামত প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ১৮৫ মতান্তরে ১৮০ হিজরী মোতাবেক ৮০১/৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সৃষ্টির সেরা মানুষ হিসেবে আল্লাহ কর্তৃক যাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে প্রধান লিঙ্গভেদে তারেকে দুভাগে ভাগ করা যায়- পুরুষ ও নারী। একত্রে এদেরকে বলা হয় মানবজাতি। মানবজাতি হিসেবে ভালো-মন বুঝার জ্ঞান স্বাভাবিকভাবে সকলের রয়েছে। মানব আত্মার সাথে পরম সত্ত্বের গভীর সম্পর্ক জাগ্রত হলে জাগতিক লোভ লালসার প্রতি মানুষের ভ্রুক্ষেপ করার সময় থাকে না। কালক্রমে সে মানবসমাজে প্রকৃত সাধক বা সাধিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। একজন নারী মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা রাখতে পারে। সাধকের মতো বিশেষ অবস্থানে থাকতে পারে। রাবেয়া বসরী (রা.) ৮ম শতকে একজন তপসী নারী হিসেবে পরিচিত নাম, যিনি তৎকালীন হাসান বসরীর শিষ্য হিসেবেও অনেকের নিকট বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদতে এমনভাবে নিজেকে মশগুল রেখেছিলেন যে, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাননি। ইলমী মজলিসে গেলেও সেখানে তিনি মনযোগ দিয়ে যাবতীয় নসিহত শ্রবণ করতেন।এক সময় ইরাকের বন্দর নগরী বসরায় অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে দস্যুবৃত্তি বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের জন্য বসরায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। কতিপয় লোক প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে জন্মভূমি বসরা নগরী ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়া শুরু করলেন। কিন্তু রাবেয়া (রা.) নিজ জন্মভূমি ত্যাগ না করে জন্মভূমি বসরাতেই থেকে গেলেন। হাদীসে রয়েছে, 'হুব্বুল ওয়াতনে মিনাল ঈমান' অর্থাৎ দেশপ্রেম ঈমানের অংশ। এককভাবে সমাজ গণ্য হয় না, বরং সামষ্টিক সমন্বয় নিয়েই সমাজ। সমাজের দুরবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে তিনি বলেছিলেন, 'মানবজাতির নিকট নবী-রাসূল ও হক পন্থি ওলামাগণ না আসতেন তাহলে মানবজাতিই সর্বপ্রথম ধ্বংস হতো।'
আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক আমাদের পার্থিব জীবন যেন শেষ করতে পারি। আমিন।