শৈশবের ছোট ছোট ঘটনা, স্মৃতি, অভিমান, আনন্দঘন মুহূর্তের আবর্তে গড়ে ওঠা, ব্যক্তি স¦াধীনতা ও মুক্তির অনুভবের ভেতর দিয়ে ‘আমার ছেলেবেলা’ শুরু।
গ্রীষ্মের দুপুরে ছাদে রোদে বসে ঘাম ঝরানো, রাতের আকাশে চাঁদের মধ্যে চরকা বুড়িকে আবিস্কার -এসব ছিল আমাদের দিনযাপনের জাদু।
মসজিদের সিন্নি খাওয়া, চোখের সামনে জিন দেখার ভয়, এবং একটি কাঠি লজেন্সের জন্য মেজমামার ঘরের বারান্দায় লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা- সবই ছিল আমাদের রঙিন পৃথিবী।
তখন আমাদের পাড়ায় টিভি ছিল না। ডি এম সাহেবের বাসায় একটি সাদা কালো টিভি ছিল। তাঁর মা থুরথুরি বুড়ি, সাদা পাটের মতো বিছানো মাথার চুল, আমরা বুড়িমার বাড়িতে, তাঁর সাথে বসে টিভি দেখতাম। টিভিতে নিজেদের খেলা দেখার আনন্দ উপভোগ করতাম। মানুষটা ছিল খুব সাদা মনের। আমরা ছোট ছোট সারিবেধে তাঁর লাল ফ্লোরে টিভি দেখার জন্য গুচ্ছ হয়ে বসতাম।
বুয়া আমাদের সামনে একটি করে প্লেট দিয়ে যেত, সেই সাথে গরম গরম পরোটা আর হালুয়া। সেই স¦াদ এখনও মুখে লেগে আছে। খাওয়া শেষে আবুমিয়া ট্রলি ঠেলে বারান্দায় নিয়ে আসতো। বুড়িমা তাঁর আঁচলে চাবির গোছা থেকে চাবি বের করে টিভি বাক্সের তালা খুলতেন। টিভি অন হলেই আমরা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকতাম। হাসতাম।
নিজেরাই খেলছি, আবার সেই খেলা টিভিতে দেখছি। নিজের খেলা নিজেরাই টিভিতে দেখা-সেটা ছিল আলাদা এক আনন্দ উচ্ছাস।
আমরা হইচই করে হাসতাম। আর বুড়িমা ফোঁকলা দাঁতে মুচকি হেসে, হাতের লাঠি টোকা দিয়ে বলতেন- “একটু চুপ করে বোস্- শোরগোল করিসনা।”
পত্রিকায় আমার প্রথম ছড়া প্রকাশের গল্পটি খানিকটা বেদনাময়। বাড়ির সবাই সেদিন আনন্দে উচ্ছাসিত হলেও বাবা ছিলেন নীরব। তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন যেন আমাকে নুতন এক পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। বাবার বিশ^াস অর্জনের জন্য বহুদিন আমাকে তাঁর ঘরের মেঝেতে বসে ছড়া,কবিতা লিখার পরীক্ষা দিতে হতো। তিনি চুপচাপ দেখতেন, শুনতেন- কিন্তু তাঁর চোখে ছিল গভীর প্রত্যাশা।
আমার ছেলেবেলার গল্পে আরও আছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ছুঁয়ে দেখার অবিস¦রণীয় স্মৃতি। ধানমন্ডি কবির বাসভবনে দলবেধে ঢোলের তালে তালে গোল হয়ে কবিকে ঘিরে কাঠিনৃত্য করছিলাম। হঠাৎ কবির এক অস¦াভাবিক চিৎকারে আমার হাত থেমে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রতিপক্ষের কাঠিরাঘাতে আমার আঙুল ফুলে ফেপে ঢোল।
সাংবাদিক,ফটোসাংবাদিকেরা, যারা একটু আগে বাড়ির দেয়াল আর গাছের ডালে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল, আমাদের খেলা দেখছিল, তারা তাড়াতাড়ি নেমে এসে কবিকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গেল। আমি গাছতলায় দাঁড়িয়ে হাতের যন্ত্রণায় কাঁদছি- কেঁদেই চলেছি-। কেউ সেদিন আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি।
এই বইতে আছে কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগমের কথাও। তিনি সেদিন কবির সাদা বিছানায় বসে হারমোনিয়ামে একটির পর একটি গান গাইছিলেন। কবি কখনো চোখ বুজে, কখনো বিস্মৃতি স্মৃতির মতো বড় বড় চোখ তুলে তাঁর সুরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। - সব মিলিয়ে আমার ছেলেবেলা সাধারণ দিনের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক অসাধারণ শৈশবের গল্প।
বইটি লিখতে গিয়ে আমাকে চোখের জল ফেলতে হয়েছে। কতগুলো স্মৃতি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যা আজও জীবন্ত, দাহ, হৃদয়ে আঘাত করে বারবার। তাই বলা যায় এই বইটি আমার চোখের জলে লেখা।
আমি এই বইতে একটি সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি-তা হলো, বাবা-মা যদি সন্তানদের সময় দেন, তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করেন, তাহলে সন্তান ঘাপটিমেরে ঘরের কোনে মোবাইল হাতে কখনও বসে থাকেনা, বিপথে যায়না।
আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি মেজমামা মোঃ বজলুর রহিম, মনি ও লিলি আপার প্রতি, যারা এই বইটি লিখতে আমাকে উৎসাহ যুগিয়েছে এবং তথ্যবহুল ঘটনা দিয়ে সাহায্য করেছে।