গত শতকের চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে মোঃ গোলাম হাবিব তদানীন্তন রংপুর জেলার কুড়িগ্রাম মহকুমার চিলমারী থানার অন্তর্গত এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামটি ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত হওয়ায় প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্রের পুনঃপুন ভাঙনের শিকার হয়েছে।
নিজ গ্রামেই তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হয়। এরপর রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তিনি খুলনার দৌলতপুর ব্রজলাল (বিএল) কলেজে জীববিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। এরপর তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পাকিস্তান ফরেস্ট্রি ইনস্টিটিউট থেকে বনবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি এবং যুক্তরাজ্যের নর্থ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে পরিবেশ ও বনবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
চাকরি জীবনে তিনি বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে পাঁচবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকে বিজয় অর্জন পর্যন্ত তিনি রণাঙ্গনে থেকে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন।
১৯৬৮ সালের ২৮ নভেম্বর সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে বন বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবন শেষে ২০০০ সালের ৩১ জুলাই প্রধান বন সংরক্ষক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বন ও বনজ সম্পদের উন্নয়ন, সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষার কাজে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন।
সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। সমাজ উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান সর্বত্র প্রশংসিত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা, বিদ্যালয়, মহিলা কলেজ, পাঠাগারসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান আজও সমাজসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
তিনি ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসন (চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি এলাকার শিক্ষা, যোগাযোগ, সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শৈশব থেকেই প্রকৃতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগের বিষয়। উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাঁকে বন বিভাগে কর্মজীবন গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। বন বিভাগের চাকরি তাঁর কাছে কোনো আকস্মিক সুযোগ (By chance) ছিল না; বরং এটি ছিল তাঁর সচেতন নির্বাচন (by choice)। প্রকৃতি, উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল সম্পর্কে অধ্যয়ন ও অনুসন্ধান আজও তাঁর আনন্দের প্রধান উৎস।
প্রকৃতিপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ নিয়ে একটি ক্ষুদ্র উদ্যান গড়ে তুলেছেন। সেখানে শতাধিক প্রজাতির ছোট-বড় গুল্ম, বীরুৎ ফল-ফলাদির উদ্ভিদ-সহ ইউকেলিপটাস ও আকাশমণি প্রজাতির গাছের সহাবস্থান লক্ষণীয়। এটি ছোট্ট পরিসরের গবেষণা কার্যও বটে।
এছাড়া তাঁর সৃষ্ট শত শত বনসাইয়ের পরিচর্যায় অবসর সময়ের একটি বড় অংশ অতিবাহিত হয়। তিনি একটি বনসাই আর্বোরেটাম (Arboretum) গড়ে তোলার কাজেও নিরলসভাবে নিয়োজিত রয়েছেন।
বন ও বনজ সম্পদ উন্নয়ন ও সংরক্ষণের কাজে তিনি তাঁর জীবনের সর্বোত্তম সময় ব্যয় করেছেন।