বাংলাদেশের অন্য আর সকল নাগরিকের মত আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এদেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করলে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তাই অন্য সকলের মত আমিও রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জিয়াকে নিয়ে যৎসামান্য চর্চা করলাম। অন্যসকল লোকের মতামতের বিচার বিশ্লেষণ এখানে হয়তো উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি, তাই কোন কোন পাঠক আমার প্রদত্ত মতের সাথে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু অন্যসকলে যদি আমার এ লেখা থেকে জিয়া সম্পর্কে সামান্য তথ্যও পান তাহলে তাকে নিয়ে আলোচনা করার সার্থকতা অন্তত কিছুটা হলেও বজায় থাকবে।
নেতাদের নিয়ে সকলে সমালোচনা করেন কিন্তু নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেউ উপস্থাপন করেন না। এখানে নেতাদের নিয়ে সকলে যে আলোচনা করে সে আলোচনায় প্রকাশ্য অংশগ্রহণ করার একটি সুযোগ গ্রহণ করেছি মাত্র। তবে এখানে যেটুকু তুলে ধরেছি তা এতবড় এক মহামানবের ওপর আমার মতামত ও ব্যাখ্যার সার সংক্ষেপ বলা চলে। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের যে কোন নাগরিক যদি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে মতামত প্রদান করতেন তিনি আমার এ আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি হয়তো বলতেন। এদিক থেকে এ আলোচনাকে একটি সংযত আলোচনা বলেই ধরে নেয়া যেতে পারে। তবে ঘটনার প্রয়োজনীয়তায় দেশের ৬৪টি জেলায় জরিপ পরিচালনা করে যে সকল তথ্য ও মতামত পেয়েছি তা উপস্থাপন করেছি। আমি কোন রাজনীতিবিদ নই। কোন রাজনৈতিক দলের সদস্যও নই।
আমার এই ক্ষুদ্র রচনাকর্ম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর রাজনীতি, অথবা রাজনীতি-রাষ্ট্রকর্ম-রাষ্ট্রনীতি সম্পৃক্ত জীবনধারার কোন মূল্যায়নও নয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে জিয়ার স্মৃতিচারণ। এর সংগে রয়েছে জিয়াউর রহমানের লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ এবং জাতীয় সংসদের ৬ষ্ঠ অধিবেশনে দেয়া ভাষণসহ বিভিন্নস্থানে দেয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের অংশবিশেষ। আমি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপর যা দেখেছি, শুনেছি, বুঝেছি সেটাই বিশ্বাস নিয়ে লিখেছি এই গ্রন্থখানিতে। আমার বক্তব্য পাঠকদের কাছে সহজ ও বোধগম্য করার লক্ষ্যে সহায়তা নিতে হয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকার। সংযোজিত করতে হয়েছে জিয়াউর রহমানের হস্তলেখা এবং ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক তার লেখা নিবন্ধ। তবে আমার বিশ্বাস, প্রয়োজন ও ঘটনাচক্রের সংগে যা এসে পড়েছে তা সংগত কারণেই এসেছে।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, কোন রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনায়ককে নিয়ে লেখা কোন রচনা রাজনীতির স্পর্শমুক্ত হতে পারে না। জানি না আমার এই রচনায় রাজনীতির কোন প্রতিচ্ছায়া পরোক্ষভাবে এসেছে কি না। সেই বিচারের ভার পাঠকের উপর। পরলোকগত কোন ব্যক্তিকে নিয়ে স্মৃতিচারণার একটি প্রধান শর্ত হলো এর বিশ্বাসযোগ্যতা। এই ধরনের স্মৃতিচারণে অনেক কথা তো বানিয়েও লেখা যায়। যেসব বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে সংশয় দেখা দিতে পারে কিংবা যে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কোন জীবিত সাক্ষ্য নেই সেই সব বিষয় এই গ্রন্থে আমি অন্তর্ভুক্ত করিনি।
এই গ্রন্থে আমি বারবার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে শুধুমাত্র ‘জিয়া’ এই নামে উল্লেখ করেছি। না, এর পেছনে আমার কোন অসাবধানতা কাজ করেনি। কোন অশ্রদ্ধাবোধও নেই এর পেছনে। আমি মনে করি খুব কাছের অগ্রজ প্রতিম কোন ব্যক্তিকে এমনিভাবে উল্লেখ করা যায়, কারণ এর পেছনে রয়েছে হৃদয়ের অনাবিল অনুরাগ, উষ্ণতা ও শ্রদ্ধা। ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও ক্ষমতার লোভে ইসলামাবাদ পিন্ডি-লাহোরের সামরিক জান্তা ১৯৭১-এ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবনে যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় এদেশের মুক্তিকামী জনতার পাল্টা আক্রমণে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিশ্চিত মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সত্য, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে খঁচিত হয়।
ঘটনার পরম্পরায় এবং এক সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন জিয়াউর রহমান। সেনাবাহিনীর লোক হয়েও তিনি গণতন্ত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠায় ছিলেন উদগ্রীব। গণতন্ত্রের প্রতি শহীদ জিয়ার অগাধ শ্রদ্ধা ও আস্থার বিষয়টি এখন তর্কাতীত। তিনি তাঁর রাজনীতি ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ রেখে গেছেন। তিনি রাজনীতির উপর থেকে বাকশালী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। নিশ্চিত করেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। এদেশের গণতন্ত্র যতটুকু পথ অতিক্রম করে আজ এপর্যায়ে এসেছে তার সবটুকু কৃতিত্ব শহীদ জিয়াউর রহমানের। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে দ্বার একদিন উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন আজ তা সংসদীয় গণতন্ত্রের সিংহদ্বারে পরিণত হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি। সমস্যা একবার চিহ্নিত হলে তার সমাধানে যে উদ্যোম প্রয়োজন তা তার জানা। সমাধানের পথটি যেন তার চেনা। স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে পথপ্রদর্শন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য যা প্রয়োজন তা তিনি করেছেন। Francis Bacon লিখেছেন বহু পূর্বেই, Men in great place are three servant of the sovereing or state servents of fame and servents of business (শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের তিনটি ক্ষেত্রে সেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়- সার্বভৌম বা রাষ্ট্রের সেবক, খ্যাতির সেবক এবং কর্মসূচীর সেবক হিসেবে) জিয়াউর রহমানের ভূমিকাও অনেকটা এমনই।