ভূমিকা
শরীয়াহ আইন নিয়ে সমকালীন বিশ্বে যেমন গভীর আগ্রহ বিদ্যমান, তেমনি রয়েছে বিস্তর বিতর্ক, সংশয় ও বিভ্রান্তি। “শরীয়াহ” শব্দটি আরবি “শারআ” ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সুস্পষ্ট পথ বা বিধিবদ্ধ জীবনদর্শন। ইসলামী পরিভাষায় শরীয়াহ বলতে বোঝায় আল্লাহ প্রদত্ত সেই সামগ্রিক নীতিমালা, যা মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে নৈতিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করে। এ আইন কেবল দণ্ডবিধির সমষ্টি নয় বরং ইবাদত, আচার-আচরণ, লেনদেন, পরিবারব্যবস্থা, বিচার প্রক্রিয়া ও শাসন নীতির সমন্বিত নির্দেশনা।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারিত হয়েছে। তবে শরীয়াহ ও ফিকহের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য অনুধাবন করা জরুরি। শরীয়াহ হলো ঐশী উৎসভিত্তিক মূলনীতি যার ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহ। আর ফিকহ হলো সেই নীতিমালার মানব-ব্যাখ্যাত ও প্রণীত আইনগত রূপ। ফলে শরীয়াহ্র উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ্) চিরন্তন হলেও তার প্রয়োগ, ব্যাখ্যা ও বিধানিক রূপায়ণ সময়, সমাজ ও বাস্তবতার আলোকে পরিবর্তনশীল হতে পারে। ইসলামী আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে বিভিন্ন মাযহাবের উদ্ভব এবং একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ফিকহী মতামত এই গতিশীলতার প্রমাণ বহন করে।
শরীয়াহ আইনের বিশ্লেষণে সাধারণত দুটি স্তর বিবেচ্য নীতিগত ও প্রয়োগিক। নীতিগত স্তরে শরীয়াহর মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে শান্তি শৃৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবজীবন, ধর্ম, বুদ্ধি, সম্পদ ও বংশরক্ষা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ আইন এখানে মূলত কল্যাণমুখী, শাস্তিমুখী নয়। প্রয়োগিক স্তরে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা হুদুদ, কিসাস ও তাজির আলোচিত হয়, যা কঠোর প্রমাণপদ্ধতি, সাক্ষ্যগ্রহণের নির্দিষ্ট মানদণ্ড এবং ন্যায়সংগত বিচার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ইসলামী ঐতিহ্যে সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত পূরণ ছাড়া দণ্ডবিধি কার্যকর করার প্রশ্ন উত্থাপিত হতো না।
বর্তমান বিশ্বে শরীয়াহ আইন বিভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে প্রচলিত। কিছু রাষ্ট্রে এটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থার অংশ; কোথাও পারিবারিক আইন যেমন বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ; আবার কোথাও ব্যক্তিগত ও নৈতিক দিক নির্দেশনা হিসেবে চর্চিত। দেশ, কাল ও স্থানভেদে সামাজিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক কাঠামো, সাংবিধানিক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এর প্রয়োগে ভিন্নতা দেখা যায়। ইসলামী আইন চিন্তায় সময় ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে বিধানের প্রয়োগে ভিন্নতার স্বীকৃতি রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও একটি সতর্কতা জরুরি। শরীয়াহর নামে কখনো কখনো কিছু গোষ্ঠী বা শাসক শ্রেণি আইনকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক আধিপত্য বা ভীতি-সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বিচার বহির্ভূত শাস্তি, ফতোয়ার অপব্যবহার, নারীর অধিকার খর্ব করা কিংবা প্রমাণবিহীন দণ্ড প্রয়োগ শরীয়াহর মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ শরীয়াহর লক্ষ্য শাস্তির প্রদর্শন নয় বরং ন্যায়, নিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।
‘শরিয়াহ্ আইন ও দণ্ডবিধির প্রয়োগ’ গ্রন্থে লেখক প্রথমে শরিয়াহ্ আইনের মৌলিক ধারণা, উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ্) এবং ন্যায়বিচারের দর্শন বিশ্লেষণ করেছেন। এরপর হুদুদ, কিসাস ও তাজিরসহ দণ্ডবিধির বিভিন্ন দিক আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, এসব বিধান অপরাধ প্রতিরোধ, সামাজিক স্থিতি ও ন্যায়সংগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রণীত। পাশাপাশি আধুনিক আইনব্যবস্থার সঙ্গে শরিয়াহ্ আইনের কিছু দিক তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে পাঠক একটি সামগ্রিক ও প্রেক্ষিতনির্ভর ধারণা লাভ করতে পারেন।
সার্বিকভাবে এই গ্রন্থের লক্ষ্য হলো শরীয়াহ আইন সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দূর করা, আবেগ নির্ভর অবস্থানের পরিবর্তে জ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা এবং শরীয়াহ্-কে শাসনের হাতিয়ার নয় বরং ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক কল্যাণের একটি নৈতিক কাঠামো হিসেবে অনুধাবনের পথ সুস্পষ্ট করা।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, বার এট-ল
সিনিয়র আইনজীবী
আপিল বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ঢাকা