‘নতুন দিগন্ত’ আব্দুর রউফ চৌধুরীর সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক উপন্যাস। এটি বাংলা-সাহিত্যে একটি অনন্য রাজনৈতিক উপন্যাসরূপে প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বৃহত্তর ভারত-উপমহাদেশের ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে অবলম্বন করে আখ্যানটি নির্মিতÑযেখানে ইতিহাস, সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের জটিল সংযোগে এক বহুমাত্রিক কাহিনির পরিসর উন্মোচিত।
বগুড়ার প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া এই উপন্যাসে নাহিদার পদচারণার এক ঝলক নাসিমের দৃষ্টিতে ধরা পড়ার মধ্যদিয়ে ঔপন্যাসিক দক্ষতার সঙ্গে আখ্যানের দ্বার উন্মোচিত করেছেন। নাসিম ও নাহিদা ক্রমে উপন্যাসের প্রধান-চরিত্রে পরিণত হয়। আনন্দের ক্ষণিক আলোয় শুরু হওয়া কাহিনি কলকাতার পরিমণ্ডলে বিষাদে রূপান্তরিত হয়; পরবর্তীতে করাচির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটির বিস্তার ও পরিণতি ঘটে। সময়কাল : ১৯৬৮-১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ।
করাচিতে আবির্ভূত হয় ভুট্টো এবং তার স্ত্রীÑআমির, নাহিদা, বেনফরত; বন্ধুপরিসরেÑসুরাইয়া, নার্গিস, রোকসানা; সন্তানদের মধ্যেÑবেনজির, নাসিমা, মোরতুজা, শাহ্ নেওয়াজ; আত্মীয়Ñপাতৌদি। সূচনায় ভুট্টো আকর্ষণীয়, তবে ক্রমে তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পায়। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পাঠককে ভুট্টোর প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে নিয়ে যান।
উপন্যাসে আরও প্রতিফলিত হয় বৃহত্তর ‘অখণ্ড বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন, প্রচলিত সমাজব্যবস্থার রূপান্তর এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্ভাবনা। রাজনৈতিক নেতাÑআইয়ুব, খুরো, ইন্দিরা, মুজিবুর রহমানের নানা স্বরূপও এখানে প্রকাশিত হয়েছে। লেখক ইতিহাসের ধারাবাহিক বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে চাননি; বরং বিভিন্ন ঘটনার পরম্পরায় একই বিষয়ের ঐতিহাসিক পরিণতি ফুটিয়ে তুলেছেন।
এখানে সর্বহারা দলের কথাও উল্লেখ রয়েছে, যার আর-এক নাম ‘ওয়ার্কার্স ফ্রেন্ডস ক্লাব’। এই দলের দর্শন এবং আদর্শ যদি যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে দেশের ও মানুষের জন্য কী অর্জন সম্ভব, তা লেখক প্রদর্শন করেছেন। দলের একজন সদস্য নাসিম আহমদ; তার সঙ্গীÑফারুখ, মতিন, যতীন। তারা নানারকম কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে উপন্যাসটি শেষ না-করা পর্যন্ত পাঠককে স্বস্তি দেয় না।
ভারত-উপমহাদেশের ইতিহাস, ব্যক্তিগত জীবনের দ্বন্দ্ব, কল্পনা ও স্বপ্নকে একত্রিত করে আব্দুর রউফ চৌধুরী একটি বহুমাত্রিক ও প্রাঞ্জল রাজনৈতিক উপন্যাস নির্মাণ করেছেন।
জন্ম : ১লা মার্চ ১৯২৯। মুকিমপুর গ্রাম, হবিগঞ্জ। মৃত্যু : ২৩ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৬। স্কাউট ভবন, হবিগঞ্জ সদর। হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে বি.এ শেষ বর্ষ সমাপ্তির পূর্বেই আউশকান্দি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে সপরিবারে পাকিস্তানে বসবাস শুরু। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে বিমান বাহিনীর চাকরি থেকে অবসর নিয়ে সপরিবারে দেশে প্রত্যাবর্তন। ১০ জানুয়ারি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে পৌঁছানো ও পরে ব্রিটিশ সরকারের এরোপ্লেন গবেষণা কেন্দ্রে স্পেশাল গ্রেডের চাকরিতে যোগদান। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্রমাগত পেশা বদল। ম্যানেজার, ইলেকট্রিক, মিস্টি, ফিটার। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকেই তিনি তাঁর বিচিত্র জীবনের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখতে শুরু করেন। আবদুর রউফ চৌধুরীর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অসংখ্য উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, সাহিত্য ও রচনাসম্ভার বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।