‘যরবে কলীম’ ১৯৩৬ সালের মে মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর দুবছর পরে কবির ইন্তিকাল হয়। ‘যরবে কলীম’ তাঁর পরিণত বয়সের লেখা। এ জন্য তাঁর চিন্তাধারা এখানে এতই সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ যে, পাঠক মাত্রই তার প্রভাব গ্রহণ না করে পারেন না।
'যরবে কলীম'-এর অর্থ কলীমের আঘাত। কলীম হচ্ছেন হযরত মূসা কলীমুল্লাহ। অর্থাৎ হযরত মূসা যেমন তাঁর লাঠির আঘাতে পাথরের বুক বিদীর্ণ করে ঝরণা ধারা প্রবাহিত করেছিলেন ইকবাল ঠিক তেমনি এ কবিতাগুলোর মাধ্যমে জাতির স্পন্দনহীন দেহে আবার নতুন প্রাণ প্রবাহ সৃষ্টি করতে এবং ঘুমন্ত মানবতাকে জাগিয়ে তুলতে চান। বইয়ের নামকরণে কবি নিজেই একথা প্রকাশ করেছেন।
মুসলমান জেগে উঠুক, আত্ম-বিশ্লেষণ করুক এবং আত্মশক্তি উপলব্ধি করে বর্তমান যুগের অমানবিক জুলুম, নিপীড়ন, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করুক - এটিই কবির একান্ত কামনা। কবি বিশ্বাস করেন, একমাত্র আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাসী একটি সত্যাশ্রয়ী মানবগোষ্ঠীই বিশ্ব মানবতাকে জুলুম-শোষণ মুক্ত করতে পারে।
...পাশ্চাত্যের বিভিন্ন মনগড়া মতবাদের বিভ্রান্তিকে ইকবাল কল্পিত মিথ্যা খোদার সাথে তুলনা করেছেন। এ কাব্যগ্রন্থে তিনি বিভিন্নভাবে এ মতবাদগুলো বিশ্লেষণ করেছেন এবং এগুলোর বিভ্রান্তির তিলিসমাতি থেকে সফলতার সাথে বের হয়ে আসার পথও নির্দেশ করেছেন। তিনি মুসলমানকে খুদীর সমুদ্রে ডুব দেবার পরামর্শ দিয়েছেন। খুদীর সমুদ্রে ডুব দেবার মানে হচ্ছে, আপন সত্তাকে পূর্ণরূপে জানা ও চিনে নেয়া। এ জন্য প্রথমে নিজেকে অধ্যয়ন করতে হবে। নিজের অন্তরকে অধ্যয়ন করতে হবে। নিজের সত্তা ও নফ্স সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হবে। তারপর নিজেকে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজের নফ্স বা খুদীর প্রচ্ছন্ন শক্তির পরিমাপ করে নির্ভুল পথে তাকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
'যরবেকলীম'-এ মূলত ইকবাল মুসলিম জাতির পতনের কারণ এবং জাতি হিসেবে পুনরায় তার দুনিয়ায় কর্তৃত্বশালী হবার পদ্ধতি নিরূপণ করেছেন। পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে আসারপূর্বে মুসলমানদের চিন্তায় জড়তা দেখা দেয়। তাদের মৌলিক চিন্তার স্রোত প্রায় শুকিয়ে যায়। সমগ্র জাতিই 'তাকলীদ' তথা অন্ধ অনুসৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এঅবস্থায় পাশ্চাত্য সভ্যতা তার আপাত মনোমুগ্ধকর মতবাদ নিয়ে হাজির হয়। এইসংগে মুসলিম এলাকাগুলোতে পাশ্চাত্য তার রাজনৈতিক আধিপত্যও বিস্তার করে। রাজনৈতিক দাসত্বের ফলেপাশ্চাত্যের মানসিক দাসত্বও মুসলমানদের জন্য স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্য সভ্যতা ওসংস্কৃতির মানদণ্ডকে মুসলমানরা গ্রহণ করে নেয়। অথচএ মানদণ্ড ছিল ইসলামী সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কবিকেমন চমৎকারভাবে বলেছেনঃ
'একদা যা মন্দ ছিল ধীরে ধীরে তা-ই হলোভালো
কেননা গোলামীতে পরিবর্তিত হয়জাতির বিবেক।'
তাই পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে কবি জিহাদ ঘোষণা করেছেন। কবিরভাষায় মুসলমান হলো 'মর্দে হর্'- স্বাধীন পুরুষ। তারআত্মাকে কেউ বন্দী করতে পারে না। মানুষের মনগড়া মতবাদের কাছেসে নতি স্বীকার করতে পারে না। সেমাথানত করে একমাত্র আল্লাহর কাছে। কুরআনের আলোকে রসূলের নির্দেশিত পথেসে অগ্রসর হয়। মুসলমান হচ্ছে 'মর্দে মুমিন' ও 'মর্দে মুজাহিদ'। আল্লাহর প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস তার হৃদয়ে শক্তি যোগায়, তার আবেগকে স্বতস্ফূর্ত করে। অন্যায় ওঅসত্যের বিরুদ্ধে সে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। কেতার সংগে এলো আর কে এলো না, এর কোনোপরোয়াই সে করে না। তারজিহাদী মনোবৃত্তি অনুভব করে শয়তানের সমগ্র সত্তা কেঁপে ওঠে এক অজানা আশংকায়। মুজাদ্দিদে আলফিসানির ন্যায় একজন মর্দে মুমিন, মর্দে মুজাহিদ ও দুর্বল ফকীর একাকী দাঁড়িয়ে যান মহাপরাক্রমশালী শাহানশাহ জালালুদ্দীন আকবরের ইসলাম বিরোধী চিন্তাধারা ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার জন্য। ভয়করেননি তিনি বাদশাহ জাহাংগীরের রক্ত চক্ষুকে। একাকী মোগলশক্তির মোকাবিলা করেন।
ইকবালের কাব্যগ্রন্থগুলোরমধ্যে 'যরবে কলীম' সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। উপমহাদেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম অংশে মুসলিম মিল্লাতের বুকে ইকবাল চিন্তা যে নতুন প্রাণের জোয়ার এনেছে তা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছি আমরা। এমনকি ইকবালের কবিতা আরবীতে অনূদিত হয়ে আজ সমগ্র আরবী সাহিত্য অংগনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং আরবী ভাষাভাষী এলাকার মুসলিম মিল্লাত ইকবাল সাহিত্যে তাদের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় ইকবাল কাব্য অনূদিত হয়েইউরোপবাসীদেরজন্য নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করছে। আজআমাদের সাহিত্য অংগনে যে জড়তা, বিভ্রান্তি, দিকভ্রষ্টতা ও হতাশা বিরাজ করছে তা দূর করার একমাত্র পথ ইকবাল সাহিত্য চর্চা।