তাসাউফ ও চার তরিকার গুরুত্ব: আহলে হক উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে আত্মশুদ্ধি বা অন্তরের পবিত্রতা অর্জন একটি ফরজ ইবাদত। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই সে সফলকাম হয়েছে, যে নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করেছে (সূরা আশ-শামস: ৯)। পরিভাষায় একে তাসাউফ বা তাজকিয়াতুন নাফস বলা হয়, যা হাদিসের ভাষায় এহসান নামে পরিচিত। আহলে হক উলামায়ে কেরামের মতে, তাসাউফ কোনো আলাদা ধর্ম বা শরিয়ত-বহির্ভূত বিষয় নয়, বরং এটি শরিয়তেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। উম্মতের আত্মিক রোগ নিরাময় ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য যুগে যুগে আল্লাহওয়ালা বুজুর্গগণ সাধনার কিছু পদ্ধতি বা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছেন। এর মধ্যে চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, কাদেরিয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া—এই চারটি প্রধান সিলসিলা বা পদ্ধতি সুপ্রতিষ্ঠিত ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য, যাদের সমষ্টিগত রূপকে চার তরিকা বলা হয়। এই চার তরিকার লড়াকু সাধনা ও জিকিরের বাহ্যিক নিয়মে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও এদের মূল গন্তব্য এক, আর তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আহলে হক উলামায়ে কেরামের মতে, শরিয়ত হলো মানুষের বাহ্যিক আমল যেমন নামাজ ও রোজা, আর তাসাউফ হলো অভ্যন্তরীণ আমল যেমন ইখলাস ও বিনয়। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। তাসাউফের মূল কাজ হলো অন্তরের রোগ—যেমন হিংসা, অহংকার ও লৌকিকতা দূর করে শরিয়তের বিধানাবলিকে নিখুঁত ও প্রাণবন্ত করা।
উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট করেন যে, তরিকার একমাত্র মাপকাঠি হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহ। শরিয়তের চুল পরিমাণ লঙ্ঘন যেখানে আছে, সেখানে তাসাউফ থাকতে পারে না। হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন, শরিয়তকে বাদ দিয়ে তরিকার সন্ধান করা অন্ধকার গলিতে পথ খোঁজার শামিল। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেমন কঠিন শারীরিক রোগ সারে না, তেমনি একজন আধ্যাত্মিক শায়খ বা পীরের তত্ত্বাবধান ছাড়া অন্তরের গোপন ব্যাধিগুলো দূর করা কঠিন। এই চার তরিকার যেকোনো একটির মাধ্যমে একজন যোগ্য পীরের হাত ধরে ইস্তিগফার, জিকির ও মুজাহাদা করলে ঈমান ও আমল দ্রুত মজবুত হয়। তাসাউফ বা তরিকত কোনো জাদুকরি বা অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের পথ নয়, বরং এটি হলো শরিয়তের হুকুমগুলো যেন অন্তরের আন্তরিকতা ও খুশু-খুজুর সাথে আদায় করা যায়, তার একটি পদ্ধতিগত অনুশীলন।
বর্তমানে তাসাউফ ও তরিকতের ক্ষেত্রে সমাজে দুটি চরমপন্থী দল বা প্রান্তিকতার সৃষ্টি হয়েছে—একদল বাড়াবাড়ি করে, অন্যদল ছাড়াছাড়ি নীতি অবলম্বন করে। আহলে হক উলামাগণ এই দুই প্রান্তিকতার মাঝখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থা প্রদর্শন করেন। প্রথম দলটি পীর-মুরিদ ও তাসাউফকে ইসলামের মূল কাঠামোর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে বসে। তারা পীরের শরিয়ত-বিরোধী কর্মকাণ্ডের অন্ধ অনুকরণ করে, পীরকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করে এবং কাশফ-ইলহামকে শরিয়তের দলিলের সমকক্ষ গণ্য করে। অনেকে মাজার কেন্দ্রিক নানা বিদআত, উরস, গান-বাজনা, পর্দা লঙ্ঘন, হালাল-হারামের সীমা অমান্য করা এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকেই তাসাউফ নাম দিয়েছে। আহলে হক উলামাগণ এই ধরনের সমস্ত বাড়াবাড়ি ও ভণ্ডামিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ঘোষণা করেন যে, শরিয়ত বাদ দিয়ে কোনো তাসাউফ হতে পারে না। অপরদিকে দ্বিতীয় দলটি সমাজে গজিয়ে ওঠা ভণ্ড পীরদের কর্মকাণ্ড দেখে তাসাউফ, তাজকিয়া বা পীর-মুরিদির পুরো সিলসিলাকেই সম্পূর্ণ অস্বীকার বা বিদআত বলে উড়িয়ে দেয়। তারা ইসলামের এই আত্মশুদ্ধির মূল ধারাটিকেও অস্বীকার করে বসে। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অন্তরের অহংকার, হিংসা ও রিয়া দূর করে ইখলাস অর্জন করা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। আহলে হক উলামাগণ এই নীতিকেও ভুল মনে করেন। কারণ, ভুয়ো ডাক্তারের কারণে যেমন আসল চিকিৎসা শাস্ত্র মিথ্যা হয়ে যায় না, তেমনি ভণ্ড পীরদের কারণে খাঁটি তাসাউফের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। সংক্ষেপে বলা যায়, আহলে হক উলামায়ে কেরামের নিকট চার তরিকা হলো আল্লাহওয়ালা হওয়ার এবং অন্তরের পবিত্রতা অর্জনের একটি পরীক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ গাইডলাইন, যেখানে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি বর্জন করে সুন্নাহর খাঁটি অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল আল্লাহর প্রকৃত মকবুল বান্দা হওয়া সম্ভব।