প্রিয়পাঠক
আপনারহাতে থাকা এই বইটি মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ - স্টিফেন হকিংয়ের 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম' এর বাংলা অনুবাদ। বিশ্বজুড়ে এক কোটিরও বেশি কপি বিক্রিত এই বইটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী একটি কাজ, যা সানডে টাইমসের বেস্টসেলার তালিকায় টানা ২৩৭ সপ্তাহ ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল।
এই বইটি অনুবাদের পেছনে আমার একটি স্বপ্ন ও দায়বদ্ধতা কাজ করেছে। আমি চাই জাতি হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিজ্ঞানভিত্তিক ও গবেষণাধর্মী হয়ে গড়ে উঠুক। আমরা সবাই জানি, একটি দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে নিয়ে যায় তার বিজ্ঞানমনস্ক জনশক্তি। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয়, নানা কারণে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিকীকরণ আজও সঠিকভাবে হয়নি। স্কুল, মাদরাসা ও কলেজগুলোতে বিজ্ঞান বিভাগে প্রচুর সিট খালি থাকে। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার জন্য শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মানসিকভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয় না, কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয় না। একটি বিজ্ঞানমনস্ক নাগরিক সমাজ ছাড়া একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠন সম্ভব নয় এটি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের বুঝতে হবে।
অনেকেইপ্রশ্ন করতে পারেন, দর্শনের একজন অধ্যাপক হয়ে আমি কেন এই বইটি অনুবাদে হাত দিলাম? আমার পড়ালেখার পরিধি ও পরিসরে 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম' নিঃসন্দেহে একটি জটিল ও কঠিন বই। কিন্তু এই বইটিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অনুধাবনে বর্তমান বিশ্বের সর্বশেষ বিজ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তার তথ্য ও তত্ত্বের অসাধারণ সম্মিলন। দর্শন বিষয়ের একজন ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে ছাত্র সমাজের প্রতি আমার একটি দায় থেকেই যায় তা হচ্ছে ছাত্রদের জ্ঞানমুখী করা, বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা, তাদের বোধ-বুদ্ধি ও মেধাকে বিজ্ঞানমুখী চিন্তায় আরও তীক্ষ্ণ ও কৌতূহলী করে তোলা। অনেকটা সেই দায়বদ্ধতা থেকেই এই বইটি অনুবাদ করেছি।
এই বইটি আপনাকে নিয়ে যাবে মহাবিশ্বের সবচেয়ে গূঢ় রহস্যগুলোর অনুসন্ধানে। আপনি জানবেন: কীভাবে একটি মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, রহস্যময় কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরকার অদ্ভুত জগৎ ও তাদের ক্রিয়াপরতা, আলোর গতি আর সময়ের প্রবাহ কীভাবে একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে, কীভাবে তারা পরস্পরকে প্রভাবিত করে, মহাকর্ষ কীভাবে বাঁকিয়ে দেয় আমাদের স্থান আর সময়কে, সময়ের শুরু থেকে সময়ের শেষ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ও সম্ভাব্য ভবিষ্যত ও বিকল্প সমুহ।
হকিংতার প্রতিভাবান লেখনীর মাধ্যমে এই জটিল সব বিষয়কে এতটা সহজ করে উপস্থাপন করেছেন যে, বিজ্ঞানে বিশেষ জ্ঞান নেই এমন পাঠকও সবকিছু দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যাবে। আপনি দেখতে শিখবেন মহাবিশ্বকে এক নতুন চোখে। এটি বুঝতে পারবেন। বইটি পড়ে আপনি শুধু জ্ঞানই অর্জন করবেন না, আপনার গোটা করবে, আপনার মেধা ও বুদ্ধিকে আরও তীক্ষ্ণ ও কৌতহলী করে তুলবে। শুধু একটি বই নয়, এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা যা আপনার চিন্তাজগতকে প্রসারিত করবে, আপনার মেধা ও বুদ্ধিকে আরও তীকক্ষ্ণ ও কৌতুহলী করে তুলবে।
অনুবাদসবসময়ই একটি জটিল কাজ, আর এই বইটির অনুবাদ তো ছিল এক অনেকগুলোরই বাংলা শব্দ নেই, বোধগম্য শব্দেরও ব্যাপক অভাব আছে। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ। ইংরেজি ভাষার মূল বইয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক পদগুলোর বইটি অনুবাদে হাত দিয়েছি কোনো সাধারণ কাজ ভেবে নয় একটি সরল, সাবলিল, প্রাঞ্জল ও সহজে বোধগম্য অনুবাদ উপহার দিতে আমার চেষ্টা ছিল নিরন্তর। বলতে গেলে পাঁচ বছর সময়ব্যাপী শ্রম ও মেধাসাধ্য এই অনুবাদ কাজটি পিঠকের কাছে কতটুকু সুখপাঠ্য হবে, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই সিদ্ধান্ত পাঠকই নেবেন।
মূল ইংরেজি বইটির একটি অসাধারণ গুণ হলো প্রতিটি অধ্যায় শেষে আপনাকে পরের অধ্যায়ে নিয়ে যেতে অনেকটা বাধ্য করে। বইটির অনুবাদে আমি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি অধ্যায়ে আমি চেষ্টা করেছি হকিংয়ের সেই রোমাঞ্চ ও কৌতুহল বাংলা ভাষায় ধরে রাখতে।
স্টিফেনহকিং (৮ জানুয়ারি, ১৯৪২ ১৪ মার্চ, ২০১৮) তার সমগ্র জীবনই উৎসর্গ করেছেন মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে। শারীরিক অক্ষমতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ৭৬ বছর বয়সে কেমব্রিজে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহান বিজ্ঞানী আজ নেই, কিন্তু তার চিন্তা ও দর্শন চিরকাল বেঁচে থাকবে এই বইয়ের মাধ্যমে।
পরিশেষে, আমি সবাইকে অনুরোধ করবো বিজ্ঞান শিক্ষায় এগিয়ে আসুন। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য একটি সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করুন। বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষার খাতার নম্বরের জন্য নয়, একটি ভালো জিপিএ'র জন্য নয়। এটি একটি বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবনবোধের জন্য, একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য।
এই অনুবাদ কার্যে যা কিছু ভুল করেছি, তার সকল দায় আমার। আশা করি, পাঠকগণ আমার এই প্রচেষ্টাকে সাদরে গ্রহণ করবেন।
বিনীত
মো. অহিদুল আলম
অধ্যাপক, দর্শন
২০তমবিসিএস
২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬