আমাদের এই অধঃপতনের পেছনে কারণ কী? একবাক্যে বললে, জ্ঞান থেকে বিচ্যুতিই অধঃপতনের কারণ। সরল কনক্লুশান মনে হতে পারে। তবে আপনি চাইলে জটিল করেও ভেবে দেখতে পারেন; এন্তার তত্ত্ব কপচাতে পারেন। শেষমেশ দেখবেন ওই একটি কথাতে এসেই চিন্তার সুতো জোড়া লাগবে।
আল্লাহ স্থির করলেন, আদাম (আ.)-কে ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেবেন। তাই তিনি তাকে ইলম শেখালেন। মূসা (আ.)-কে ফিরআউনের ওপর বিজয়ী করবেন। তাই তুর পাহাড়ে চল্লিশ রাত ধরে জ্ঞানের সঙ্গে তার সম্বন্ধ করালেন। নবিজিকে কুরাইশ-সহ গোটা মানবজাতির নেতা বানাবেন। তাই হেরার নির্জন গুহায় তাকে দিলেন ইলমি দীক্ষা। তার মানে, শ্রেষ্ঠত্বের সিক্রেট ওই একটাই—নলেজ।
সভ্যতার উত্থান-পতনের গল্পটাও প্রায় একই রকম। সেখানেও ইন্ধন হচ্ছে গিয়ে নলেজ। একটা কমন-প্যাটার্ন আপনি সবসময় খুঁজে পাবেন। শুরুর দিকে একটি জাতি পঠন-পাঠনে লেগে থাকে। যার ফলে, একসময় তারা সভ্যতার চুড়োয় পৌঁছুয়। কিন্তু সভ্যতার চুড়োয় পৌঁছুবার পর—হাতে যখন জমা পড়ে বিস্তর টাকাকড়ি ধনসম্পদ—তারা ডুবে যায় ভোগ-বিলাসে। আস্তে আস্তে ইলমের সঙ্গে বাড়তে থাকে যোজন-দূরত্ব। ফলাফল—সভ্যতার পতন। নির্ঘাত পতন।
দুঃখের কথা হচ্ছে, উম্মাহকে অধঃপতন থেকে টেনে তুলবার প্রয়াস আমাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। বরং অধঃপতনের পালে সবাই কেমন যেন হাওয়াই লাগায়। আরও ভোগ-বিলাস, আরও ইনকাম, আরও ফেমাসিটি, আরও ফেসবুকিং…। সেই ব্যথা থেকেই আমাদের এই ক্ষুদে প্রয়াস। এই বই পড়ে একজন মানুষও যদি ইলমের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন, উম্মাহর অধঃপতনের সুলুক সন্ধান করতে পারেন—তবেই আমাদের প্রচেষ্টা সার্থক।
পড়াশোনা করেছেন ঢাকা আলিয়া ও অন্যান্য স্বনামধন্য মাদরাসায়। এ ছাড়াও কওমি অঙ্গনের সাথে তার আছে নিবিড় বন্ধন। মাড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনাও। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগ ছিল গণযোগাযোগ। ফলে, যোগাযোগের কলকবজা তিনি ভালোই রপ্ত করেছেন। এই প্রজন্মের ভাষা ও আকাঙ্ক্ষা তিনি বোঝেন। আর এ যোগ্যতাটিকেই, তিনি তার দাওয়াতি-টুল্স হিসেবে কাজে লাগাতে সংকল্পবদ্ধ। আজ থেকে তেরোশ বছর আগে, কোনো এক তাবিয়ির-বলা কথাকে, আজকের তরুণরা ঠিক কতটুকু বুঝতে পারে? বর্তমানের সাথে মিলিয়ে কতটুকু পাঠ করতে পারে? ঠিক এখানটাতেই সালেহ আজাদীর বিশেষত্ব। তিনি তরুণদের সামনে অতীতকে হাজির করেন বর্তমানের ভাষায়। তিনি অতীত-হাতড়ে শ্যাওলা-ধরা-মুক্তো আহরণ করেন, তারপর সেই মুক্তোকে ঘষেমেজে ঝকঝকে-তকতকে করে, পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেন। মোটকথা, কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফদের কথামালাকে রিভাইভ করা, আর সেসবের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরাই—তার দাওয়াতি প্রকল্পের অন্যতম এমবিশান। ইনকাম অ্যান্ড মাইন্ডসেট সালেহ আজাদীর প্রথম বই। পয়লা বইতেই তিনি তার ভাষাগত নৈপুণ্যের ছাপ রেখেছেন। তার বর্ণনার ঢং অনবদ্য। তিনি লেখেন এমনভাবে—যেন পাঠকের সামনে বসে কথা বলছেন। আশাকরি, মাওলানা সালেহ আজাদীর এ-বই পাঠকের চিন্তার প্যারাডাইম বদলে দেবে।